Blog

বিলাতে বাংলা কবিতা উৎসব ২০০৮ প্রসঙ্গে

01/09/2009 12:36

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

 

বিলাতে বাংলা কবিতা উৎসব, লন্ডন’ শীর্ষক কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে কুইনমেরী ইউনির্ভাসিটিতে কলেজে চব্বিশে আগস্ট তারিখে। এর আগে বহু বছর ধরে সাহিত্য সম্মেলন হয়েছে। নাট্যোৎসব হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত ও শামসুর রাহমানকে নিয়ে আলোচনা সভা ও কাব্যসভাও হয়েছে বহুবার। কলকাতা ও ঢাকা থেকে বহু নামীদামী কবি সাহিত্যিক এসব সভাতেও বহুবার এসেছেন। বিলাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা লাভের সূচনা মূলত সত্তরের দশকে হলেও সম্ভবত তার জয়যাত্রার আরম্ভ আশির দশক থেকে।
এখন একুশ শতকের এই প্রথম দশকে ইস্টএন্ডের যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বলা চলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির তৃতীয় শক্তিশালী কেন্দ্র এখন লন্ডনই। এই অবস্থাটির জন্য ভবিষ্যতে নিউইয়র্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত নিউইয়র্কের অবস্থান চতুর্থ কেন্দ্র হিসেবে বলেই অনেকে মনে করেন। নিউইয়র্কেও এখন বড় বড় সাংস্কৃতিক সমাবেশ হয়। সেগুলো মূলত কালচারাল ফেস্টিভ্যাল। কিন্তু লন্ডনে বৈশাখী মেলার মতো বড় রকমের কালচারাল ফেস্টিভ্যালের সংখ্যা কম হলেও আয়তনে ছোট লিটারারি ফেস্টিভ্যালের সংখ্যা অনেক বেশি। তার প্রমাণ লন্ডনে কেবল বাংলা কবিতাকে কেন্দ্র করে চব্বিশে আগস্টের এই উৎসব। এই উৎসবকে বলা চলবে বাংলা কবিতার ত্রিবেণী সঙ্গম। ঢাকা ও কলকাতার সঙ্গে ইউরোপের বাংলা কবিতার প্রাণ প্রবাহের এখানে এক ধরণের মোহনা সৃষ্টি হতে দেখা যাবে। যার গতি ক্রমশই বেগবান হচ্ছে।
আমি যখন সত্তরের গোড়ায় লন্ডনে আসি, তখন বাংলা সাহিত্যের চারা বিলাতের মাটিতে মাত্র অঙ্কুর গজাতে শুরু কেরেছে। সংবাদপত্র বলতে সাপ্তাহিক জনমত। সাহিত্য পত্রিকা ছিলো না। হিরণ্ময় ভট্টাচার্য পূর্ব লন্ডনের রেডব্রিজ থেকে ’সাগরপারে’ নামে একটি দ্বিমাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন। তিনি নিজেও ছিলেন কথাশিল্পী। তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের লন্ডন প্রবাসী কিছু কবি-সাহিত্যিক জড়িত ছিলেন।
বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক বলতে তখন হাতে গোনা কয়েকজনকে মাত্র চিনতাম। তার বিবিসি রেডিও’র বাংলা বিভাগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যেমন সৈয়দ শামসুল হক, সিরাজুর রহমান, কাদের মাহমুদ, মাহমুদ হাসান, শফিক রেহমান, তালেয়া রেহমান, শামিম চৌধুরী প্রমুখ।
বিবিসি’র বাইরেও কয়েকজন সাহিত্যিক সাংবাদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। যেমন একটি আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন আবদুল মতিন ও আমির আলি। শিক্ষকতা করতেন সালমা নাসির ডলি ও সালেহা চৌধুরী। চিকিৎসার পেশায় ছিলেন ডা. কুদরতুল ইসলাম। এরা কবি এবং কথাশিল্পী দুই-ই। বার্মিংহামে থাকতেন ডা. মাসুদ আহমদ। পেশায় চিকিৎসক হলেও ছোটগল্প ও নাটক লেখা ও মঞ্চায়নে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। খ্যাতি অর্জন করেছেন। আশির দশকের দিকে এই গরুপে এসে যুক্ত হন কবি ও কথাশিল্পী শামীম আজাদ। পেশা শিক্ষকতা। এদের মধ্যে সালেহা চৌধুরী ও শামীম আজাদ ইংরেজিতেও কাব্য চর্চায় পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। আরও পরে বিবিসি’র বাংলা বিভাগে ঢাকা থেকে এসে যোগ দেন ঊর্মি রহমান। তিনি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক দুই-ই। বাংলাদেশের আরও একজন আধুনিক কবি দীর্ঘকাল ধরে লন্ডন প্রবাসী। তিনি দেবব্রত চৌধুরী। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থই পাঠক প্রিয়তা অর্জন করেছিল।
আগেই বলেছি, আশির দশকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিশু চারাটি বিলাতে বেশ বড়সরো হয়ে ডালপালা ছড়াতে শুরু করে। এর একটা বড় কারণ, এই সময় বাংলাদেশ থেকে প্রচুর শিক্ষিত বাঙালি ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে বিলাতে আসতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন পেশায় যোগ দেন। প্রচুর ছাত্রছাত্রী আসতে শুরু করে বিলাতে উচ্চশিক্ষার জন্য তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি-সভ্যতাকেও। ফলে লন্ডন থেকে শুরু করে বিলাতের ছোটবড় নানা শহরে চীনা বসতির মতো বাঙালি বসতিও গড়ে ওঠে। চায়না টাউনের মতো বাংলা টাউনও গড়ে উঠেছে লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে। বাংলা সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে। রেডিও টিভি সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কবি নজরুল সেন্টার, বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূর্ব লন্ডনের শহীদ আলতাব আলী পার্কে একুশের ভাষা শহীদদের স্মরণে ঢাকার ভাষা শহীদ মিনারের অনুকরণে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লন্ডন থেকে সাহিত্য সাময়িকীও বেরিয়েছে অনেক। কবিতা সংকলন অগুনতি বেরিয়েছে। তা ঢাকা বা কলকাতার কবিতা সংকলনের চাইতে খুব নুন্যমানের নয়। লন্ডন থেকে একটি কবিতা-পত্রিকা বের করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন আশির দশকের একটু আগের কবি ফরিদ আহমদ রেজা। এছাড়া সাহিত্য সাময়িকী বেরিয়েছে নূরুল হোসেনের অভিমত. সুকুমার মজুমদারের প্রবাসী সমাচার, আকাশ ইসহাকের তৃতীয়ধারা। লন্ডনের বাংলা সাহিত্য পরিষদও অনিয়মিত সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করছেন।
এ সকল পত্রিকার মধ্যে আমার দৃষ্টি সবচাইতে বেশি আকর্ষণ করেছিল তরুণ কবি ও সাহিত্যিক ফারুক আহমদ রনির সম্পাদিত ’শিকড়’ পত্রিকা। পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ছিলেন লোকমান আহমদ, সাইফুদ্দীন আহমদ বাবর ও ফরিদা ইয়াসমিন জেসি। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ পর্যন্ত এই সাহিত্য সাময়িকীটি বাজারে চালু ছিল। শব্দপাঠ ও একটি ভাল সাহিত্য কাগজ। আতাউর রহমান মিলাদ ও আবু মকসুদের সম্পাদনায় বের হয়।
যেহেতু বিলাতে বাংলা কবিতা উৎসব উপলক্ষে এই নিবন্ধটি লিখছি, সেহেতু কবিতার প্রসঙ্গে ফিরে যাই। কথাশিল্পী, নাটক, প্রবন্ধ নিয়ে আরেকটি প্রবন্ধে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইলো। বিলাতে আশির দশক থেকে যে তরুণ কবিরা গড়ে উঠেছেন, তাদের মধ্যে রবীন্দ্র-নজরুল যুগের কাব্যধারার অনুসারী দু’একজন পাওয়া যাবে না তা নয়। কিন্তু অধিকাংশই ত্রিশের এবং উত্তর তিরিশের আধুনিক কাব্যধারার অনুসারী। জীবনানন্দ থেকে শামসুর রাহমান- ত্রিশের এবং উত্তর তিরিশের অনেক শক্তিশালী কবির প্রভাব তাদের অনেকের কবিতায় দেখা যায়। তাদের কবিতায় স্বদেশ এবং বিদেশের  চিন্তা চেতনার মিশ্রণ বাংলা কবিতাকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছে। যা এখনো পূর্ণ ও পরিণত চরিত্র পায়নি। কিন্তু পাওয়ার পথে।
আশির ও নব্বইয়ের দশকে বিলাতে যারা কবি হিসেবে যশ ও খ্যাতি কুড়িয়েছেন তাদের নামের তালিকা দীর্ঘ। আমি তাদের কয়েকজনের নাম নিচে উল্লেখ করছি। এদের অনেকের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আশির দশকের কবিদের মধ্যে আছেন আতাউর রহমান মিলাদ (কবি ও কথাশিল্পী দুই-ই), আবদুল মুখতার মুকিত, সাফিয়া জহির, ফারুক আহমদ রনি (কবি ও কথাশিল্পী দুই-ই), মাসুদা ভাট্টি (কবি ও কথাশিল্পী) আবু তাহের (মূলত ছড়া লেখক), দিনার হোসেন, দিলু নাসের (ছড়া), মাজেদ বিশ্বাস, রেজওয়ান মারুফ, বাসেরা ইসলাম রেখা, আহমদ ময়েজ, আবু মকসুদ, ইকবাল হোসেন বুলবুল, মাশুক ইবনে আনিস, দীনুজ্জামান, সৈয়দ শাহীন, সৈয়দ বেলাল আহমদ প্রমুখ।

নব্বইয়ের কবিদের তালিকাও ছোট নয়। শামীম শাহান, শাহ শামীম আহমদ, সুমন সুপান্থ, ওয়ালি মাহমুদ, ফরিদা ইয়াসমিন জেসি (কবি ও কথাশিল্পী), আনোয়ারুল ইসলাম অভি, শামসুল জাকি স্বপন, সাঈম চৌধুরী, দিলওয়ার হোসেন মঞ্জু এবং আরও অনেকে। এদের মধ্যে অনেক শক্তিশালী কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক এবং নাট্যকারও আছেন।
আমার লেখায় লন্ডনের কবি সাহিত্যিকদের এই নামের দীর্ঘ তালিকা দেওয়ার উদ্দেশ্য এই যে, একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মহাদেশে এবং ভিন্ন ভাষা সংস্কৃতি সভ্যতার দেশে, সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহাওয়ায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই যে দ্রুত শিকড় বিস্তার চলছে এটাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্যের শক্তি ও স¤প্রসারণশীলতার প্রমাণ বহন করে। বিকলাতে আজ বাংলা কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই উৎসব যে শুধু বিলাতে নয়, সারা ইউরোপে একদিন তার শিকড় ছড়াবে তাতে সন্দেহ নেই। আমার বিশ্বাস ইংরেজি ও ফরাসী ভাষার সাম্রাজ্যের মতো সারা বিশ্বে একদিন বাংলারও ভাষা সাম্রাজ্য গড়ে উঠবে। বিলাতে এখন তারই শিকড়োদ্গম দেখছি।

লন্ডন, ১৮ আগস্ট

বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চা এবং নতুন প্রজন্ম

29/08/2009 20:55

 

মাসুদা ভাট্টি
 

এই যে ব্রিটেনের দুষ্প্রাপ্য রোদের গ্রীষ্ম, মানুষ যখন ছুটছে ছুটি কাটাতে এদেশে-সেদেশে নিদেন ব্রিটেনেরই কোনও সমুদ্র সৈকতে তখন কয়েকজন সাহিত্য-প্রেমী, বাংলা ভাষা-প্রেমী মিলে আয়োজন করছেন কবিতা উৎসব। কী প্রয়োজন ছিল এসবের? এর চেয়ে তো ভালো ছিল বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন ধুম-ধারাক্কা ধরনের শিল্পী-নাচিয়ে এনে একটা জমজমাট অনুষ্ঠান আয়োজন করা, যার টিকিট বিক্রি থেকে আয়োজকরা অন্ততপক্ষে ছ’মাসের জীবন চালানোর রসদ জোগাড় করতে পারতেন। কিংবা তার চেয়েও ভালো হতো, ঘরের খেয়ে বনের মোষ না তাড়িয়ে এই ছুটিটা নিশ্চিন্তে উপভোগ করাটা। কিন্তু সেরকম কিছুই না করে তারা কেন একটি অলাভজনক কবিতা উৎসবের আয়োজন করলেন? কেনই বা তারা দীর্ঘ মাসাধিক সময় খরচ করে, উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে এই কবিতা উৎসব করতে যাচ্ছেন? আসলে এই প্রশ্নটির উত্তরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে “বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চা এবং নতুন প্রজন্ম” শীর্ষক নিবন্ধের মূল বক্তব্য।

মানুষের ইতিহাস এবং সাহিত্য চর্চা ঠিক একই পায়ে হেঁটে আজকে যেখানে মানুষের অবস্থান ঠিক সেখানেই সাহিত্য চর্চারও অবস্থান। সেই গুহাবাস যুগে মানুষ তার ভেতরকার সৃষ্টিশীলতাকে ফুটিয়ে তুলেছিল গুহাগাত্রে ছবি এঁকে। তারপর মানুষ ক্রমশ: এগিয়েছে আজকের দিকে, তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশও এগিয়েছে একই গতিতে। তাই একথা জোর দিয়েই বলবো যে, বাংলাদেশেও যে কারণে একজন মানুষ সাহিত্য চর্চা করেন ঠিক একই কারণে প্রবাসে তথা এই বিলেতেও একজন বাঙালি সাহিত্য চর্চা করেন। মনের তাগিদে সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটানোর এই প্রচেষ্টা মানুষের শাশ্বত এবং প্রকৃতিদত্ত; এর বাইরে অন্য কোনও কারণ নেই, থাকতে পারে না।তবে প্রশ্ন হলো, সাহিত্য চর্চাকে জীবন ও জীবিকার প্রধান বাহক হিসেবে নেয়াটা কতোখানি সম্ভব বা তা আদৌ সম্ভব কি না? আজ ইংরেজিসহ বিশ্বের প্রধান কয়েকটি ভাষার লেখককুল শুধুমাত্র লিখেই জীবিকা ধারণ করেন। এক্ষেত্রে অনেক ভাষার লেখককেই জীবন ধারণের জন্য লেখালেখির বাইরে কিছু না কিছু করতে হয়, বা করে থাকেন। এমনকি বাংলাদেশেও হাতে গোনা দু’একজন ছাড়া প্রত্যেক লেখকই লেখালেখির বাইরে জীবন ধারণের জন্য কিছু না কিছু করে থাকেন। তাতে কি তাদের সৃষ্টিশীলতা কিংবা যা লেখেন তার শিল্পগুণ কিছুমাত্র কমে? আমি বিশ্বাস করি না। পূর্ণ সময়ের লেখক ও খণ্ডকালীন লেখক বলতে আসলে কিছু নেই, একজন মানুষ তার ভেতরকার তাগিদে যাই-ই কিছু কলমের ডগা দিয়ে খাতায় ফুটিয়ে তোলেন, তাই-ই শিল্প, এর মান নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন কিন্তু তার এই তাগিদ কিংবা তা প্রকাশ করার তাড়না নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনওই অবকাশ নেই। একথাগুলি এ জন্যই বলছি যে, এই প্রবাসে যখন প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যায়ন হয় অর্থের নিক্তিতে, জীবনের অপর নাম যেখানে ছুটোছুটি সেখানে একজন মানুষ কেন লেখেন, সেই প্রশ্নের উত্তরটা খোঁজার জন্য।
আজকে এখানে যারা উপস্থিত আছেন তাদের মধ্যে অনেকেই কিছু না কিছু লেখেন। কেউ কবিতা বা ছড়া, কেউ গল্প, কেউ উপন্যাস, কেউ বা প্রবন্ধ। একথা মেনে এবং জেনেই তারা লেখেন যে, এগুলো হয়তো কোনও দিনই কোথাও ছাপা হবে না কিংবা ছাপা হলেও তা হয়তো একসময় পুরনো কাগজ হয় হারিয়ে যাবে, কিন্তু তাতে কি? লেখার আনন্দেই আমরা লিখি, তাই নয় কি? সময়ের ক্লান্তি, কর্মক্ষেত্রের গ্লানি, সংসারের হাজারো ঝামেলা সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে যায় এক লাইন কবিতার কাছে, এক প্যারা ছোট গল্পের কাছে কিংবা একটি ছোট্ট উপন্যাসের কাছে। এই ব্রিটেনে দীর্ঘ দিন যাবত বসবাস করছেন একুশের গানের অমর গীতিকার আবদুল গফফার চৌধুরী। এখন তিনি পৌঁছেছেন পেনশনের বয়সে কিন্তু তিনি যখন এখানে এসেছিলেন তখন তিনি যুবক ছিলেন, ইচ্ছে করলেই লেখালেখির এই পথ ছেড়ে দিয়ে তিনি যে কোনও ব্যবসা করতে পারতেন, পারতেন কোনও প্রতিষ্ঠানে একটি চাকুরী নিয়ে নিশ্চিত জীবন কাটিয়ে দিতে। কিন্তু তিনি তা করেননি, তিনি হেঁটেছেন লেখালেখির ভয়ঙ্কর এক অনিশ্চিত পথে। প্রতিদিনকার খবরের কাগজে তিনি কলাম লিখেছেন, চেষ্টা করেছেন অর্থ ধার করে কাগজ বের করতে আর এর জন্য তিনি কম হেনস্থা হননি, জীবনের কাছে বার বার তাকে হোঁচট খেতে হয়েছে, অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মুখ দেখেননি, এমনকি হয়তো একটি রাতও তিনি অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে ঘুমোতেও যেতে পারেননি। কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি কি পেয়েছেন? হয়তো রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু বলার জন্য তিনি সোল এজেন্সি অর্জন করেছেন এবং সর্বোপরি বাংলা ভাষার একজন লেখক হিসেবে তার নাম প্রত্যেককেই উচ্চারণ করতে হবে কিন্তু তিনিতো এটা না করলেও পারতেন? আমি নিশ্চিত যে, শুধুমাত্র খ্যাতির জন্য মানুষ জীবনের এতো বড় ছাড় দিতে পারে না। এর পেছনে থাকে আরও অনেক বড় কিছু, সেটা হয়তো আর কিছুই নয়, মানুষের অন্তরের তাড়না, দেশ ও ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং সেই সঙ্গে লেখার প্রতি প্রতিশ্রুতি। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাই বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাসের একজন আইকন। আমরা তাকে কেন্দ্র করেই এখানকার সাহিত্য চর্চা এবং নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে আলোচনা শুরু করতে পারি, বিস্তারও ঘটাতে পারি এবং তাকে দিয়েই শেষ করতে পারি।
এখানে একজন লেখক যখন একটি কবিতা কিংবা ছোটগল্প বা প্রবন্ধ লেখেন তখন তা ছাপানোর জন্য প্রথমেই পাঠান স্থানীয় বাংলা পত্রিকাগুলোতে। সম্পাদকের কাঁচির ভেতর দিয়ে যখন তা মুদ্রিত হয়ে পাঠকের সামনে আসে তখন তা একজন লেখককে যে কতোখানি ভালোলাগায় অভিভূত করে তা ভাষা দিয়ে প্রকাশ করার যোগ্যতা কিন্তু সেই লেখক রাখেন কিনা সন্দেহ। কারণ এই অনুভূতি শুধুমাত্র উপলব্ধি করা যায়, তাকে ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা আসলেই সম্ভব নয়। এই আনন্দ অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয় বলেই একজন সফল ব্যবসায়ী, একজন উচ্চ বেতনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে একজন সাধারণ গৃহিনী পর্যন্ত সকল কর্মব্যস্ততার পরও খাতা-কমল ধরেন, কিছু একটা লেখার চেষ্টা করেন। আর তাদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসেন একেকজন লেখক, আগেই বলেছি সবাই হয়তো খুব বড় লেখক হন না, সবার লেখার সাহিত্য মানও ঠিক যোগ্যতার মাপ কাঠিতে টেকে না, কিন্তু তাই বলে কারো প্রচেষ্টাকেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
আজ এই ব্রিটেন থেকে লিখে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে সুনাম অর্জন করেছেন এমন অনেকেই আছেন। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা এই প্রবাসী বাঙালিদের ভেতর থেকেই একজন ঝুম্পা লাহিড়ী কিংবা খালেদ হোসেইনিকে পাবো কিন্তু তার আগে বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চার বর্তমান অবস্থাটা জেনে নেওয়া যাক। এখানে একটি কথা জোর দিয়েই বলবো যে, এখানে সাহিত্য চর্চাটা খুব বিক্ষিপ্ত।তবে এটাও ঠিক যে, আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশেও যেখানে সাহিত্য চর্চাটা বিক্ষিপ্ত, একজন পুরোটাই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ সেখানে বিলেতের বাঙালিদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। একটু ব্যাখ্যা করছি বিষয়টা। বাংলাদেশে আজকাল লেখক তৈরি করে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা। এর মধ্যে বিশেষ একটি পত্রিকা আবার তাদের গৃহপালিত লেখক ছাড়া কাউকে লেখকের মর্যাদাই দিতে চায় না। তাদের সাহিত্য পাতায় যারা লেখেন তাদের বইই পুরস্কৃত হয় এবং তারা লেখকের মর্যাদায় ভূষিত হন। প্রতি বছর ঘটা করে কোনও কর্পোরেটের স্পন্সরশীপে জমজমাট আনুষ্ঠানিকতায় এই লেখকদের পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। আর বলাই বাহুল্য যে, এতে প্রতিভার বিকাশ না ঘটে, অপমৃত্যুই ঘটে বেশি। এখানে উপস্থিত যারা আছেন তাদের মধ্যে যারা গল্প-উপন্যাস-কবিতার পাঠক তাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে, বুকে হাত রেখে বলুন তো গত কয়েক বছরে আপনারা এমন কোনও বাংলা উপন্যাস পড়েছেন কি যা বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী আসন দখল করতে পারে বলে আপনাদের মনে হয়েছে? আমি নিজে একজন লেখক, আমার নিজেরও বেশ কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে, তারপরও আমি নিশ্চিন্তে বলতে পারি যে, না এমন কোনও উপন্যাস আমি অন্তত পড়িনি যাকে আমি ধ্রুপদী আসনে বসাতে পারি। অবশ্যই এখানে পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত উপন্যাসের কথা আমি বলছি না, আমি বলছি বাংলাদেশের লেখক এবং তাদের লেখার কথা।
তার মানে কি ভালো উপন্যাস লেখা হচ্ছে না? আমি এটাও মানতে নারাজ যে, ভালো উপন্যাস কেউ লিখছেন না, কিংবা লিখতে পারেন না। আশি পাতায় উপন্যাসের ব্যাপ্তি বেঁধে দেওয়া হলে, ছোটগল্প আর কবিতার বই বিক্রি হয় না বলে প্রকাশকরা ছাপাতে আগ্রহী না হলে সাহিত্য চর্চার অবনতি ঘটাটাই স্বাভাবিক। আর সেই সঙ্গে যদি লেখককে তার রাজনীতি কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থান দিয়ে বিচার করাটাই কালচারে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে সাহিত্য চর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ না করে উপায় থাকে কি? তাই শুধু এই বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা নয়, আমি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়েই আসলে যার পর নাই শঙ্কিত। কেন শঙ্কিত সে কথা আস্তে-ধীরে বলি, তার আগে বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চার ভেতর-বাহির নিয়ে কিছু কথা বলে নিই।
আগেই বলেছি যে, সাহিত্য চর্চার খাতটি মূলত: অলাভজনক, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বরং অর্থ ব্যয়ের কারণ হয়ে থাকে। সময়ের অপচয়তো বটেই। কিন্তু তারপরও মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম বলেই মানুষ সাহিত্য চর্চা করে থাকে। সাহিত্য চর্চা একটি চলমান বিষয়, নানা সময়ে এর দিক এবং প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন ঘটে থাকে। যেমন এক সময় কবি-লেখকগণ একসঙ্গে বসে নিজেদের লেখা পড়তেন এবং তা প্রকাশের আগে একে অপরের সমালোচনার মাধ্যমে লেখাকে জারিত করে তারপর তা প্রকাশ করতেন। এখনও যে এরকমটি ঘটে না তা নয়, এখন লেখকরা নানা শিবিরে বিভক্ত কিন্তু তারপরও একেকটি গ্রুপ নিজেদের মধ্যে তাদের লেখা নিয়ে নিশ্চিত ভাবেই আলোচনায় বসেন, তবে একথাও ঠিক যে, সেখানে সমালোচনার চেয়ে পিঠ চাপড়ানিই বেশি হয়ে থাকে। তারপরও এর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। দ্বিতীয় যে পথটি বহুল ব্যবহৃত তাহলো, পত্র-পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত লেখা এবং তা নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনা ও চিঠি বা ই-মেইলে পাওয়া পাঠকের সমালোচনা। ব্রিটেনের বাংলা পত্রপত্রিকাতো বটেই, বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলি খুললেও আজ বিলেত প্রবাসী অনেকেরই লেখা পাওয়া যায়। আর তৃতীয় যে মাধ্যমটি আজ বাংলাদেশের মূলধারায় সাহিত্য চর্চার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি তাহলো একুশের বইমেলা। আজকাল শুধু প্রবাসী লেখকরাই নন, অনেক সচেতন প্রবাসী পরিবার ফেব্রুয়ারি মাসকে দেশে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বেছে নেন কারণ এই মাসে বাংলাদেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে বই মেলা নিয়ে।এই বই মেলাকে কেন্দ্র করে যদি প্রতি বছর হাজার পাঁচেক পুস্তক প্রকাশিত হয়ে থাকে তাহলে তার মধ্যে পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থের লেখক প্রবাসী বাঙালি লেখক এবং তার মধ্যে নিঃসন্দেহে বিলেত প্রবাসী লেখকরা এগিয়ে আছেন সংখ্যার দিক থেকে।
একটি মজার বিষয় আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি না করে পারছি না। আজকাল দেশে প্রবাসী লেখকদের বেশ কদর, কারণ কিছু প্রকাশক এই প্রবাসী লেখকদের কাছ থেকে সাহিত্য চর্চার হাদিয়া বেশ চড়া হারেই আদায় করে থাকেন। এমনিতেই বাংলা ভাষায় লিখে অর্থ উপার্জন হিমালয় ডিঙানোর মতোই দুরূহ তার ওপর যদি আবার অর্থ দিয়ে বই প্রকাশ করতে হয় তাহলে প্রবাসী লেখকের সম্মানী প্রাপ্তিটা বোধ হয় অধরাই থেকে যাবে। বিষয়টি এখানে উপস্থিত লেখকদের সকলকেই ভেবে দেখার অনূর্ধ্ব জানাচ্ছি। যাই-ই হোক, দেশে যেমন ঈদ সংখ্যায় কে ক’টা উপন্যাস লিখলেন, আর বই মেলায় কার ক’টা বই বেরুলো তা দিয়ে লেখকের মান বিচার হয় তেমনই বই প্রকাশের আর লেখা প্রকাশের দিক দিয়ে বিচার করলে বিলেতে বাংলা সাহিত্য চর্চা ভালোই হয়। আমি সাহিত্য চর্চার মান নিয়ে কিছু বলছি না, তা নিয়ে অন্য কোনও সময়, অন্য কোনও খানে কথা বলা যাবে।
এখন নতুন প্রজন্ম নিয়ে কিছু বলে এই নিবন্ধের ইতি টানতে চাই। বলা হয়েছিল যে, কম্পিউটার মানুষের বই পাঠের অভ্যাস পরিবর্তন করে দেবে এবং পুস্তক ব্যবসা লাটে উঠবে। কিন্তু তা হয়নি, এমনকি সিনেমা-টেলিভিশনের মতো শক্তিশালী মাধ্যমও পারেনি বই পাঠের জনপ্রিয়তা কমাতে। এটা প্রমাণিত হয় এই ব্রিটেনে একেকটি বইয়ে ৫-৭ মিলিয়ন কপি বিক্রি হওয়ার ঘটনা থেকেই। কিন্তু বাংলাদেশ এবং বাংলা সাহিত্যের বেলায় এর সত্যতা খানিকটা পাওয়া যায়। স্যাটেলাইট টেলিভিশন যদি বাঙালি মধ্যবিত্তের বই পাঠের অভ্যাসে চিড় ধরিয়ে থাকে তাহলে কম্পিউটার নিঃসন্দেহে বাঙালি তরুণ প্রজন্মকে বই পড়া থেকে দূরে সরিয়েছে খানিকটা হলেও। তবে একথাও সত্য যে, বাংলাদেশে বাংলা মাধ্যমে পড়া তরুণ প্রজন্ম এখনও বই পড়ে, বই কেনে এবং তারাই এখনও পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ। অপরদিকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ডিজুস প্রজন্ম আধো বাংলা আধো ইংরেজিতে কথা বলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী নিয়ে কর্পোরেট বাণিজ্যে চাকুরী নিয়ে কাড়ি কাড়ি অর্থোপার্জন করে ঠিকই কিন্তু তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে সাহিত্যের অবস্থান নিতান্তই শূন্যের কোঠায়। ধরে নিচ্ছি তারা তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের বাংলা উপন্যাস পড়তে পারে না কিন্তু তাই বলে তারা কিন্তু হালের অমিতাভ ঘোষ, অরুন্ধতী রয় কিংবা খালেদ হোসেইনিও যে খুব একটা পড়ে তা কিন্তু নয়। একই কথা প্রযোজ্য বিলেতের তরুণ বাঙালি প্রজন্মের ক্ষেত্রেও। তারা নিজেদেরকে ব্রিটিশ বলে ভাবে ঠিকই, কিন্তু ক’জন বাঙালি তরুণ মার্গারেট এ্যাটউড বা মার্টিন এ্যামিস পড়ে তা নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। কেউ কেউ হয়তো পড়ে ঠিকই কিন্তু তাদের হাতে গুণে বের করা যায়। তার মানে এটাই যে, বাঙালি তরুণ প্রজন্মের কাছে শুধু বাংলা সাহিত্যই নয়, বিশ্ব সাহিত্যও উপেক্ষিত। তারা নিজেদের পরিচিতি নিয়ে এক মহা বিপাকে পড়েছে, তারা না পারছে মেইন স্ট্রীমে নিজেদের অবস্থান করে নিতে, না পারছে হুমায়ূন আহমেদ বা আনিসুল হকের রচনার স্বাদ নিতে। তারা বেড়ে উঠছে সাহিত্য চর্চাহীন এক উদ্ভট শূন্যতায়। এতে তাদের দোষ কতোখানি আর কতোখানি তারা পরিস্থিতির শিকার তা সত্যিই গবেষণার দাবি রাখে। এই স্বল্প পরিসরে আমি তার কারণ খুঁজতে যাবো না, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী।
তবে আগেই বলেছি যে, এই শূন্যতার ভেতর থেকেও হয়তো আমরা একদিন পেয়ে যাবো একজন ঝুম্পা লাহিড়ী কিংবা খালেদ হোসেইনিকে। কেউ হয়তো বলবেন যে, মণিকা আলী আছেন আমাদের। হ্যাঁ তিনি আছেন ঠিকই, তাকে নিয়ে আমরা গর্বিতও, ব্রিটিশ মূলধারায় আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারি কিন্তু নিজের কাছে সত্য গোপন করার নামতো আত্মপ্রবঞ্চনা, তাই না? আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এই যে, প্রবাসে বসে বাংলায় লিখছি, একটি দিনের অনেকটা সময় ব্যয় করি এই লেখালেখির পেছনে, অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয় এই লেখার জন্য, কেন করছি এসব?হয়তো এই সময়টা অন্য কিছুর পেছনে দিলে এই প্রবাস জীবনে খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্য যোগ করা যেতো। এসব চিন্তা যখন মনের ভেতর আসে তখন নিজেকে কষে এক ধমক দিই, বুকের মাঝে চিনচিনে এক গর্ব নিয়ে বলি, “আমি লেখক, আমি লিখি, আমি বাংলা ভাষায় লিখি, আর কেউ না হোক, আমি নিজের জন্য লিখি, এই গ্রীষ্মে স্পেইনের উজ্জ্বল সূর্য যাকে ইচ্ছে তাকে আনন্দ দিক, আমাকে আমার গল্পের একটি শব্দ তার ঢের বেশি আনন্দ দেয়। আমি সেই আনন্দে আলোকিত”। এখানে উপস্থিত যারা লেখেন, তারা কি এরকম করেই ভাবেন না? আমি নিশ্চিত যে, এরকমটাই ভাবেন।

বাংরেজি’র উৎপাত

29/08/2009 20:48

 


বাংরেজি’র উৎপাত
- কাদের মাহমুদ


 ১.
মানুষের কোন ভাষাই অক্ষয় নয়, অথবা দুর্ভেদ্য প্রাকারও নয়। ভাষার যেমন উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে তেমনি এর অধঃপতন ও বিলুপ্তি-ও হয়। সংস্কৃত একদা পুরোহিতের বেদবাক্য উচ্চারণের ভাষা তো ছিলোই, আরো ছিলো মহাকাব্যের অমোঘ ভাষা। আজ আর সে মহাকাব্য রচিত হয় না, সংস্কৃতের সে চর্চাও নেই। সংস্কৃতের মতো লাটিনও ছিলো ধ্রুপদ সাহিত্য ও ধর্মের ভাষা। অথচ এ দুটি প্রবল ভাষা কখনোই সাধারণ মানুষের ভাষা হয়ে ওঠে নি। সে কারণে, দুটি ভাষাই আজ মৃত।
প্রশ্ন, মানুষের ভাষা কখন শুরু হয়?
সাংকেতিক (দৈহিক অঙ্গভঙ্গীর মাধ্যমে), মৌখিক, ও লেখ্য Ñএই তিন প্রধান প্রকারে মানুষের ভাষা এসেছে। প্রথম দুটো আদি প্রকরণের প্রমাণ মানুষের কাছে নেই; ধারণ করা যায় নি বলে এরা হারিয়ে গেছে। কত বছর আগে মানুষ ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেছিলো, তা-ও এখনো ভাষাবিদ ও নৃতাত্ত্বিকদের অনুমানের উপর নির্ভরশীল। ৫ লাখ থেকে ৫০ হাজার বছর। আদি বাসভূমি আফ্রিকাতে গিয়ে, সেখানে আদি মানুষের ফসিল কংকাল বিশ্লেষণ ক’রেও উৎপত্তির সঠিক সময় ঠাহর করা সম্ভব হচ্ছে না।
 তবে কী ভাবে ভাষার উদ্ভব হয়?
একটি বৈজ্ঞানিক একটি গল্প¡  আছে। মানবের উষাকালে ইউরোপে দুটি গোত্র ছিলো। একটি গোত্র ছিলো দৈহিকভাবে বলশালী, কর্মক্ষম, দুঃসাহসী ও দুর্ধর্ষ; -বরফের মতো ঠান্ডা ও ঝড়ো এবং রুদ্র প্রকৃতির সাথে যুঝে টিকে থাকার জন্যে দরকারি দৈহিক গুণাবালী তাদের ছিলো। একই সময় আর একটি গোত্র ছিলো, যারা দৈহিক বল ও বৈভবে, তুলনামূলক ভাবে, দুর্বল ছিলো। কালে দেখা গেলো, বলশালী গোত্রটি এক সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অথচ, এদের চেয়ে দুর্বল গোত্রটি টিকে যায়। কী করে? বিশ্লেষণ ক’রে দেখা যায়, দুর্বল দলটির টিকে থাকার কারণ, তাদের একটি ভাষা ছিলো। এই ভাষায় তারা নিজেরই কেবল কথা বলতো না, বেঁচে থাকার সে সব বুদ্ধি আর কৌশল তারা উদ্ভাবন করেছিলো, সেগুলো তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে শিখিয়ে যেতে পারতো। এই ভাবে, প্রাণে বেঁচে থাকার বিদ্যা লাভ ও বর্ধন করতে পেরে, গোত্রটি বংশ বৃদ্ধি করে দীর্ঘায়ু হতে পেরেছিলো।
কী করে মানুষের ভাষা শুরু হয়, তা সন্ধান করার ব্যাপারে নানা প্রবাদ আছে। ফেরাউন পিসামটিক দুটো শিশুকে বোবা-কালা লোকের হাতে দিয়ে লালন করান। বহু পরে, তার কাছে এদের হাজির করা হয়। কেবল একটি শিশু যে একটি শব্দ উচ্চারণ করতে পেরেছিলো সেটাকে প্রিজিয়ান ভাষার রুটির প্রতিশব্দ মনে করা হয়। তাই মিশরের রাজাও ধরে নেন, মানুষের আদি ভাষা ছিলো, ফ্রিজিয়ান। স্কটল্যান্ডের রাজা ৫ম জেমসও এমন একটি পরীক্ষা করে দেখতে পান, তার শিশুরা হিব্র“ ভাষা বলছে। মধ্যযুগের সম্রাট ২য় ফ্রেডারিক এবং আকবার বাদশাহও এমন নীরিক্ষা করেন। তবে এ ক্ষেত্রে শিশুরা কথাই বলে নি। 
কেবল প্রমাণ আছে যে, মাত্র হাজার ৯ বছর আগে, কৃষিজীবি মানুষ লিখতে শুরু করেছিলো সাংকেতিক ভাষায়। এ দিয়ে তারা ফসল ও সম্পত্তির হিসেব রাখতো।
মনে হয়, প্রাণী হিসেবে মানুষের বিকাশের সাথে সাথে, বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে যত চিন্ময় হতে হয়েছে ততই সে বাঙ্গময় হয়ে উঠেছে। আমরা জানি, মানুষের ভাষা ভাব বিনিময়ের বাহন। এই ভাব আবার মুখ্যতঃ দু প্রকারের। ব্যবহারিক ও আবেগিক। যখন প্রাণরক্ষা বা জীবনচর্চায় ভাষাকে ব্যবহার করা হয় তখন সেটা হয় ব্যবহারিক। নিত্যদিনের প্রয়োগিক বা আটপৌড়ে ভাষাও বটে। ভাষার এই ব্যবহারটাই অধিকতরো ও ব্যাপকতরো। মানুষ যখন তার মনের- দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা, আশা- হতাশা, স্বপ্ন ও কল্পনা, রাগ-ক্ষোভ, ইর্ষা-ঘৃণা ইত্যাদি প্রকাশ করার জন্যে ভাষাকে ব্যবহার করে, তখন সেটা, আবেগিক।
জীবন রক্ষার প্রয়োজনে শিক্ষা, তথাÑ শিকার, খাদ্যসংগ্রহ ও উৎপাদনের বিদ্যা এবং তথ্য বিনিময় করার মাধ্যমে হয়তো ভাষার সূচনা হয়। তবে পরে-পরে, যুদ্ধ, অভিযান, আক্রমন, দখল, জয়-পরাজয়, সন্ধি-মৈত্রী, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো কাজে ভাষার প্রয়োজন হয়েছে। পথ প্রদর্শক, দলনেতা, গোত্র প্রধান, রাজা, সেনাপতি, ওঝা ও চিকিৎসককে সাধারণের সাথে ভাব বিনিময়ে ভাষার দরকার হয়েছে। একদিন ক্রেতা ও বিক্রেতাকে মুখের ভাষায় লেন-দেন করতে হয়েছে। একদিন ধ্যানী ও মুনি-ঋষিকেও কথা বলতে হয়েছে। কবি কবিতা আবৃত্তি করেছে, গায়ক গান গেয়ে শুনিয়েছে। সমাজবদ্ধ ও পারিবারিক জীব হিসেবে মানুষের জীবনে প্রীতি-আদর, স্নেহ-মমতা, আদর-যতœ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা’র ভাষা তো স্বতঃই উৎসারিত হয় । 
এই ভাবে, একটি গোত্রের একটি ভাষা হয়েছে, আবার অন্য গোত্রের মিলনে ও মিশ্রনে অথবা সংঘাতে তাদের ভাষার বদল হয়েছে বা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ভাষা হয়ে উঠেছে। কখনো একটি গোত্র বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে তাদের ভাষাটি অক্ষুন্ন বা অনুন্নত থেকে গেছে কিম্বা স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়েছে; বিজিত গোত্ররা বিজয়ীদের কাছে নিজেদের ভাষা হারিয়েছে। কখনো কয়েকটি ভাষা পাশাপশি গড়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক কারণে কোন গোত্র বিলুপ্ত হলে, তার ভাষাও হারিয়ে গেছে।
এখন চারটি কথা। এক, ভাষা একটি মানব গোত্রের আত্ম-পতাকা বা আত্ম-পরিমা বলে পরিচিত হয়। তাই কোন ভাষা ক্ষুন্ন হ’লে, গোত্রটি আহত বা পদানত হয়। দুই, ভিন্ন গোত্রের ভাষা শিখে ফেলার মধ্যেও উপকার আছে, দোভাষী ও পর্যটক এর প্রমাণ। তিন, ভিন্ন গোত্র-জাতির সাথে যোগাযোগ ও লেনদেনে ভাষা সমৃদ্ধ হয়। যেমনÑ পালি ও সংস্কৃত তো আছেই, তারপর আরবী, ফার্সী, ইংরেজি, পর্তুগীজ, উর্দু সহ নানা ভাষার শব্দ আসায় বাংলা আজ বর্ণালী ও জোরদার ভাষা। যেমন, বহু ভাষার শব্দে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে ইংরেজি ভাষা। চার, ভাষা বহতা নদীর মতো, সে আপন নিয়মে চলে।                
২.
আমাদের বাংলা ভাষার বিকাশেও এই স্তরগুলো কোন না কোন ভাবে দেখা দিয়েছে। বাংলা ভাষার উদ্ভব প্রাকৃতে অর্থাৎ মুখের বা কথ্য ভাষায়, সেখানে এটার শিকড় প্রযোগিক প্রকরণে : মানুষ জীবনের তাগিদে নিজেরাই এই ভাষা তৈরি করেছে। আদিতে বৌদ্ধ ধর্মীয় ভাষা, পালির সমর্থন পেলেও, তখনকার হিন্দু শাসক ও তাদের ধর্মের ভাষা, সংস্কৃত যারা চর্চার করতেন, উভয়ের উপেক্ষা ও অবজ্ঞায় শিকার হয়। সেখানেই বাংলার স্ফুরণ ও লালন হয়। সংস্কৃতভাষীরা বাংলাকে ধিক্কার দিতো ‘‘পাখি’র ভাষা’’ বলে।  তখন না মন্দিরে বা তিথিতে, না রাজদরবারে তার ঠাই ছিলো। তবে কালে কালে বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম জীবনের ছাপ পড়েছে বাংলা ভাষায়।
মুসলিম শাসন আমলে এসে বাংলার রাজদরবারে বাংলার কিছুটা ঠাই হয়। দিল্লীতে ছিলোই না। ফার্সী ছিলো রাজভাষা। তবে বাংলাদেশে তখন সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের কাজে-কর্মে আর সাহিত্যে ও সঙ্গীতে ছিলো বাংলার একান্ত ঠাঁই। বৃটিশ আমলে রাজাভাষা হয় ইরেজি। তরে রক্ষে, এ সময় শিক্ষায়, বাংলার ঠাঁই হয়েছিলো। তখন শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় যাত্রা। প্রথম দিকে, সংস্কৃতকে লিখিত বাংলার উপর জোর ক’রে চাপিয়ে দেয়ার একটা চেষ্টা হয়, তবে তা পাকা হতে পারে নি। একই সময়, শিক্ষিত বাঙালিদের মুখের ভাষায় ইংরেজি শব্দের আতিশয্য ছিলো, তবে এটাও টেকে নি।
১৯ শতকের বাংলা কবি আব্দুল হাকিম (১৬২০-১৯৯০) সংস্কৃত, আরবী ও ফার্সী জানতেন, তবে তখনি সখেদে বলেছিলেন যে, যারা বাংলাদেশে জন্ম নিয়েও বাংলা ভাষাকে হিংসা করে তাদের জন্মের ঠিকানা তিনি জানেন না।   

যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।।
   সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
অখন্ড বাংলাদেশে এর পরেও, সংস্কৃত শিক্ষিতদের মতো, আরবী-ফার্সী শিক্ষিতরাও বাংলাকে নিজস্ব, বিশেষতঃ ধর্মের ভাষা বলে ধরতেন না। একজন হিন্দু প্রথম কোরাণ শরীফ আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। সারা বাংলাদেশেই উচ্চশ্রেণীর মুসলমান বলে কথিত পবিারারগুলোতে আরবী, ফার্সী ও উর্দু চর্চা হতো, বাংলা হতো না। এদের মধ্যে পূর্ববঙ্গে ঢাকার নবাব পরিবার সহ ঢাকার কিছু উর্দুভাষী পরিবার এবং কোলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গে বহু পরিবারের কথা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। ফলে, বিশেষ করে পাকিস্তান আন্দোলনের সূচনাকাল থেকে, বাংলা মুসলমানের ভাষা কি-না, এ রকম একটা বিতর্ক শিক্ষিত মহলে জোরদার হয়। এই বিতর্ক পাকিস্তান হবার পরেই ঐতিহাসিক রূপ লাভ করে। জিন্নাহ বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানান, ঢাকা নবাব বাড়ীর খাজা নাজিমুদ্দিন সেই তালে নাচেন। ১৯৫২ সনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে বিক্ষোভ মিছিলের উপর মুসলিম লীগ সরকারের পুৃলিশ গুলী চালায়। ফলে ঐতিহাসিক রক্তরাঙা শহীদ দিবসের সূচনা হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে সাথে, সরকারিভাবে ও প্ররোচনায় নানা দূরভিসন্ধিমূলক প্রচারণা চালানো হয়, যেমন- বাংলা হিন্দুর ভাষা Ñমুসলমানে ভাষা নয়; এতে ইসলাম ধর্ম চর্চা করা য্য় না । কখনো আরবী হরফে বাংলা লেখা, রোমান হরফে বাংলা লেখা, এমন কি বাংলা ভাষা কঠির বলে প্রমাণ করার নামে ‘সোজা’ বাংলাকে ‘স-ও-জ-আ’ লেখার অপচেষ্টা করা হয়। এরা কখনোই স্বীকার করে না যে, পৃথিবীতে যে গুটিকয় ধ্বনিতাত্ত্বিক ভাষা আছে, বাংলা তাদের একটি। বাংলা ভাষার গৌরবকেও তারা অক্লেশে মানে নি। বিশ্বকবি রবীন্দনাথ ঠাকুরকে তারা বর্জন করার ধৃষ্টতা দেখায়।   
১৯৫২ সনের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধ’রে, ১৯৭১ সনে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্ত হয়, ১৯৭৩ সনে সর্বপ্রথম বাংলায় সংবিধান রচিত হয়। অবশেষে আশা করা গিয়েছিলো, অচীরে একদিন বাংলাদেশের প্রশাসন, বিচার-আদালত ও শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা।
আজ ৩৬ বছর পরে, পরিস্থিতিটি কী?
৩.
আজ বাংলাদেশে সংবিধানের মূল প্রাসঙ্গিক ভাষা ইংরেজি Ñবাংলা নয়। প্রাশসনের ভাষা কতকটা ইংরেজি ও কতকটা বাংলা। আদালতেও তথৈবচ। আর শিক্ষায়? সেখানে চলছে ভয়ঙ্কর অরাজকতা। দেশজুড়ে একাধারে ইংরেজি, আরবী ও বাংলা মাধ্যমে শিশুদের পড়ানো হচ্ছে।
ফলে, বাংলাদেশে জন্ম নিয়েও, সেখানে এমন শিশুরা আছে যারা বাংলা ভাষায় নিরক্ষর। তারা ইংরেজি জানে, আরবী জানে কিন্তু বাংলা জানে না। আপনারা হয়তো ভাববেন, কি বিচিত্র বাংলাদেশ!
প্রধানতঃ রাজধানী ঢাকার ধনী এলাকা ও বাড়িগুলোতে ইংরেজি পড়ুয়া বটে কিন্তু বাংলায় অশিক্ষিত শিশু, কিশোর, কিশোরী ও তরুণ-তরুণীর দল আছে, যারা তাদের মা-বাবা’র গর্বের ধন। এদের মুখের ভাষা এক বিচিত্র মিশ্রন। অনেকটা যেমন বিলেতে বাঙালি ছেলে-মেয়েরা খানিকটা সিলেটী, খানিকটা ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলে; যে ভাষা কেবল তারাই ভলো বোঝে। বাংলাদেশে’র ধনীর আদরের দুলাল-দুলালী’দের মুখের মিশ্র ভাষা, যাকে আমি বলি, বাংরেজি: এর কিছুটা বাংলা, অনেকটাই ইংরেজি। এ নিয়ে দেশে আমি লিখেছিও, পরে আরো লেখালেখি হয়েছে। একটি বাংলা পত্রিকা আমার এ বিষয়ক লেখা ছাপাতে অস্বীকার করে; কারণ এই পত্রিকাতেই বাংরেজি’র প্রবল সমর্থন আছে।
ঢাকায় দুটি রেডিও স্টেশন আছে, নামÑ ‘ফুর্তি’ ও ‘রেডিও ওয়ান’। এই দুটিতেই, বিশেষ ক’রে ‘ফুর্তি’তে বাংরেজি’র এ›তার চর্চা হচ্ছ্।ে মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে, একুশের বই মেলায় আরো দুয়েকটা কুকীর্তির মতো, ‘রেডিও ফুর্তি’কেও ঠাঁই দেয়া হয়।
টেলিভিশনগুলো প্রবল সংযোগ মাধ্যম বলে, তাদের কুকীর্তির মাত্রা কম নয়। তাদের নাম, তাদের অনুণ্ঠনের নাম যদি ধরেন দেখবেন সেখানে ইংরেজি দাঁত খিচিয়ে আছে। কোন কোন উপস্থাপকের ভাষা নির্ভেজাল বাংরেজি। বাংলাদেশে বসে শুনলে মনে হবে কোন বিদেশি অনুষ্ঠান শুনছেন। অনেক বাংলা নাটকের সংলাপেও, ইংরেজির আবশ্যক ছাড়াও, অহরহ অঢেল অনাবশ্যক অনুপ্রবেশ আছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, বাংলা সংবাদ। এগুলোতে অহরহ বিদেশি তো বটেই, দেশি লোকেরও, মন্তব্য থাকে Ñযা পুরো ইংরেজি ভাষায়, অথচ সাথে বাংলা অনুবাদ থাকে না। কেবল তাই নয়, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, শ্রমিক নেতা, আমলা, সাবেক মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধানকে যখন টেলিভিশনের পর্দায় দেখেন, তখন শুনবেন তাদের ভাষায় কেমন ক’রে ইংরেজির খই ফোটে।
টিভিতে ব্যবহৃত অগণিত ইংরেজি শব্দের মধ্যে, একদিন এক বাঙালি বুদ্ধিজীবি অবলীলায় ‘ওহপড়হংরংঃবহঃ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যাচাই করে দেখার জন্যে আমি এমএ বিএ পাশ কয়েকজন বাঙালির কাছে শব্দটির অর্থ জানতে চাই। তারা কেউ এর অর্থ বলতে পারে নি। এখন বুঝুন!
তাই প্রশ্ন, যেখানে বেতার ও টেলিভিশন গণ-মাধ্যম Ñসর্ব শ্রেণীর মাধ্যম এবং যেখানে বাংলাদেশের জনগনের শতকরা মাত্র ৪৩.১% ভাগ কেবল সাক্ষর অর্থাৎ শুধু লিখতে পড়তে জানে, সেখানে ইংরেজির এই বাড়াবাড়ির অর্থ কি? দেশের বেশির ভাগ মানুষই যদি বুঝতে না-পারে তবে কা’দের জন্যে এগুলো প্রচার বা চর্চা করা হয়? সহ্য করা হয়?
বাংলাদেশে তেমন নয়, তবে পশ্চিম বঙ্গের বাঙালি লেখকদের বইপত্রে বেশি করে মিশ্র বাংরেজি দেখতে পাওয়া যায়। ভারতে তো তাদের হিন্দী রাষ্ট্র ভাষা আছে, আর ইংরেজি আছে আন্তঃরাজ্য মাধ্যম বা কার্যতঃ ২য় রাষ্ট্রভাষা। সেখানকার প্রয়োজন বাংলাদেশ থেকে আত্যন্তিকভাবে ভিন্ন। বাংলাদেশে তার ‘হনুকরণ’ হবে কেন?         
কিছু লোকের বিদেশ যাওয়া বা বিদেশে শিক্ষালাভ বা চাকুরি করার জন্যে ইংরেজি ভালো ভাবে তাদের শেখার সীমিত দরকার তো আছেই। তাই বলে সুপ্রতিষ্ঠিত ও বলিষ্ঠ বাংলা ভাষার উপর ইংরেজি শব্দের উৎপাত চাপানো কেন? তাই প্রশ্ন, সজ্ঞাতে কি অজ্ঞাতে, আজকে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বাঙাালিরা কি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কোন হীন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে? 
-০-
৮ই জুলাই ২০০৮
 

 

 

 

 

 

বিলেতে বাংলা সাহিত্য সাময়িকী

29/08/2009 03:01

বিলেতে বাংলা সাহিত্য সাময়িকী

 
বিলেতে বাংলা সাহিত্য সাময়িকী
- দিলু নাসের

 

বিলেতে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯১৬ সালে। এর ধারাবাহিকতায় নিয়মিত অনিয়মিত ভাবেএ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য বাংলা কাগজ। কিন্তু বাঙালীর হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাহিত্য কবে কখন কিভাবে এদেশে প্রকাশিত হয়েছে এর সার্বিক কোন ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তবে ধরে নেয়া যেতে পারে এই ভিন্ন  দেশে  ভিন্ন মাটিতে প্রথম বাংলা বর্ণমালা চাষের সময় থেকেই হয়তো সাহিত্যের প্রকাশ শুরু হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বিশ্বনন্দিত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিলেতে বসেই বাংলা ভাষায় রচনা করেছেন তার অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথেরও আগে আরেক খ্যাত নামা কবি মাইকেল মধুসুদন দত্তও কবিতা লিখেছেন বিলেতে বসে। হয়তো তার কোন বিখ্যাত কবিতার জন্ম এখানেই হয়েছে। সে সময় নিশ্চয়ই কবিতা প্রকাশের কোন না কোন মাধ্যম ছিলো এখানে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিলেতে অনেক বাঙালি আসতে শুরু করেন। বিশেষ করে পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে বেশ কিছু সৃজনশীল মানুষের আগমন ঘটে এদেশে। বাঙালির ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধিকার আন্দোলনের সময় এখান থেকেই প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি বাংলা কাগজ। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলো তাছাদ্দুক আহমদ সম্পাদিক দেশের ডাক। ১৯৫৪ সালের একুশে ফেব্র“য়ারিতে প্রথম প্রকাশিত এই কাগজের বিভিন্ন সংখ্যায় বেশ কিছু রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।
বাঙালির হিরন্ময় মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডন থেকে প্রকাশিত কাগজগুলোতে কিছু কিছু কবিতা, গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে সেসময় পত্রিকা প্রকাশে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হতো সম্পাদক এবং প্রকাশদের।  এছাড়াও যেমন ছিলো লেখকের অভাব তেমনি ছিলো স্থান সংকুলতা।
বিলেতের প্রথম সাহিত্যের কাগজ ‘সাগর পারে’ হিরন্ময় ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। এই কাগজের পর পর তিন সংখ্যার প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলী। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই কাগজটি নিয়মিত ও অনিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এতে লিখেছেন পশ্চিম বাংলার খ্যাতনামা লেখক এবং বিলেতের অনেক কবি সাহিত্যিকরা।
সাপ্তাহিক জনমত বিলেতের দীর্ঘস্থায়ী প্রাচীন বাংলা কাগজ। সাহিত্য প্রচার এবং প্রকাশে জনমত অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন সময়ে এতে কাজ করেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক এবং সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। তাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় ভিত্তি স্থাপন হয়েছে বিলেতে নিয়মিত বাংলা সাহিত্য প্রকাশের। বিশিষ্ট কবি এবং সাহিত্যিক কাদের মাহমুদ জনমতের সাথে যুক্ত ছিলেন সত্তর দশকের শেষের দিক থেকে আশির মাঝামাঝি পর্যন্ত। আশির দশকের শুরু থেকে তার সম্পাদনায়  জনমতে শুরু হয় নিয়মিত সাহিত্য পাতা প্রকাশের।  মাহবুব রশীদ ও রুনু’র চমৎকার অলংকরণে জনমতে প্রকাশিত হয় ধারাবাহিক উপন্যাস, গল্প, কবিতা এবং ছড়া। আর এসব প্রকাশনার মাধ্যমে বাড়তে থাকে সৃষ্টিশীল  লেখকের সংখ্যা। শুরুতে আশির দশকই ছিলো বিলেতের বাংলা সাহিত্যের বীজবপনের প্রথম সোপান। সেসময় বাংলা সাহিত্যকে বুকে ধারণ করে বিলেতে আসেন- বেশ কিছু প্রতিভাবান তরুন লেখক এবং তাদের হাত ধরেই সেসময় গড়ে উঠে সাহিত্যের প্রথম আন্দোলন; গঠন করা হয় বিলেতে বাঙালি লেখকদের প্রথম সাহিত্যের সংগঠন ‘বাংলা সাহিত্য পরিষদ’।
সেসময় সাপ্তাহিক সুরমার তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইয়াং রাইটার্স গ্র“প’ এবং এই শিরোনামে প্রকাশিত হতে থাকে একঝাক নবীন লেখকদের সৃজনশীল লেখা। এই সব লেখা লেখকদের মাধ্যমে বিলেতে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তা লাভ করেছে ।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিলেতে আসেন সমকালীন বাংলা কবিতার কালোত্তীর্ণ লেখক গণমানুষের কবি দিলওয়ার। তার এই উপস্থিতিকে ঘিরে সরব হয় বিলেতের সাহিত্যাঙ্গন। সংগঠিত হন নবীন-প্রবীণ লেখকেরা এবং নতুন পুরাতনের মধ্যে সৃষ্টি হয়  সেতুবন্ধন।
‘সুরমা ইয়াং রাইটার্স গ্র“প’ এর নিয়মিত লেখা প্রকাশ এবং নবীন লেখকদের উৎসাহ প্রদানের কারণে ১৯৮৭ সালে পূর্ব লন্ডনের টয়েনবি হলে অনুষ্ঠিত হয়  লন্ডনের প্রথম বাংলা কবিতা উৎসব। জাগরণ নামে আরেকটি সাপ্তাহিকীতে ছিলো চমৎকার সাহিত্যের পাতা। প্রতি সপ্তাহে জাগরনের পাতায় যাদের সরব উপস্থিতি ছিলো তারা হলেন- শিকদার কামাল, আতাউর রহমান মিলাদ, সৈয়দ শাহিন, ফারুক আহমেদ রনি, আব্দুল মুকতার মুকিত, দিলু নাসেরসহ  আরো অনেকে।
সেসময় বাংলাদেশ থেকে আসা একঝাঁক কবিতা কর্মীর প্রাণের পত্রিকা ছিলো জাগরণ। টাইপ সেটিং এবং প্রকাশনার অনেক অসুবিধা থাকা সত্বেও জাগরনের কর্মীরা প্রতি সপ্তাহে দুটি পাতা বরাদ্ধ রাখতেন সাহিত্যের জন্য। দেশে তখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। দেশের সকল কবি সাহিত্যিকেরা, তখন সেই আন্দোলনের সাথে জড়িত বিলেতে এসেও এর ঢেউ লাগে। প্রবাসী কবিরা জাগরণের পাতায় তাদের প্রতিবাদী শব্দ চয়নের মাধ্যমে দূর থেকে যোগ দেন সেই আন্দোলনে। ’৮৭ মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক নতুন দিন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন সেই পত্রিকার প্রধান চালক। তার তত্ত্বাবধানে শুরু থেকে নতুন দিনে সাহিত্যের পাতা ছিলো উজ্জ্বল। বিলেতের লেখকদের পাশাপাশি প্রকাশিত হতো বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য লেখকদের সেরা লেখা। শামসুর রাহমান, সৈয়দ সামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণসহ বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের সমকালীন লেখার সাথে পরিচিত হন বিলেতের পাঠকরা।
বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক গাজীউল হাসান খানের সম্পাদনায় প্রকাশিত দেশ বার্তায়ও সেসময় প্রকাশিত হতো সৃজনশীল সাহিত্যের পাতা। ডাঃ মাসুদ আহমদ লিখতেন ধারাবাহিক রচনা ‘চন্দ্রবিন্দু’। ছাপা হতো কবিতা, গল্প এবং গাজীউল হাসান খানের বিলেতের পটভূমিকায় রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস ‘জনপদ’। এসব লেখা প্রকাশ এবং লেখকদের সরব উপস্থিতির কারণে বিলেতে বাংলা সাহিত্যাঙ্গন চাঙ্গা হয়ে উঠে। যার ফলশ্র“তিতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বাংলা সাহিত্য সম্মেলন এবং বই মেলা। সম্মেলনে আসেন বাংলাদেশ থেকে শামসুর রাহমান এবং পশ্চিম বাংলা সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়। আর বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল বিলেতকে আখ্যায়িত করেন বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় চারণ ভূমি হিসেবে। পরবর্তী কালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সম্পাদনায় আরো দুটি সাপ্তাহিকীর জন্ম হয় নতুন দেশ এবং পূর্ব দেশ। এদুটিতে আমি নিজে নিয়মিত সাহিত্যের পাতা প্রকাশের নিয়মিত চেষ্টা করেছি। সাপ্তাহিক পত্রিকা ছাড়াও বিলেতে সেসময় প্রকাশিত হয় নিয়মিত অনিয়মিত ভাবে বেশ কয়েকটি সাহিত্যের কাগজ। কবি মাসুদ আহমদের সম্পাদনায় বার্মিংহাম থেকে প্রকাশিত হয় একটি চমৎকার কাগজ। যার উদ্যোগে ১৯৮৭সালে সামারে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য সম্মেলন। এ সম্মেলন ছিলো বিলেতের কবি সাহিত্যিকদের মিলন মেলা। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত আরেক দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্য সাময়িকীর নাম প্রবাসী সমাচার। সম্পাদনায় ছিলেন সুকুমার মজুমদার। এ সাময়িকী পশ্চিম বঙ্গের লেখকদের সাথে বিলেতের লেখদের যোগসূত্র হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে এবং ১৯৯৩ পর্যন্ত পাক্ষিক হিসেবে প্রকাশিত হয়।
‘সাহিত্য হোক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৮৯সালের ফেব্র“য়ারিতে প্রকাশিত হয় সংহতি সাহিত্য সংস্থার সাহিত্যের কাগজ ‘সংহতি’। কবি ফারুক আহমদ রনি এবং আবু তাহেরের যৌথ সম্পদনায় এই কাগজটি সম্পূর্ণ ছিলো সাহিত্যের। এতে বিলেতের লেখক ছাড়াও বাংলাদেশের লেখকদের লেখা ছাপা হতো। বিভিন্ন কারনে কাগজটির আয়ূস্কাল ছিলো অল্প। তবে ১৯৯৮সালে প্রকাশিত হয় ফারুক আহমদ রনির সম্পাদিত সাহিত্য এবং সংস্কৃতির একটি চমৎকার কাগজ ‘শিকড়’। শিকড়ই বিলেতের প্রথম এবং একমাত্র কাগজ। এতে স্থান পেতো বিলেত প্রবাসী লেখকদের লেখা। এছাড়াও বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখকদের লেখা। শিকড়ে যেমন ছিলো উন্নত লেখা তেমনি আকর্ষনীয় প্রচ্ছদের জন্য কাগজটি দ্রুত দেশে-বিদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করে। শিকড় বিলেতের প্রথম কাগজ যা ওয়েব সাইডের মাধ্যমে বিলেতের বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ববাঙালির কাছে পৌছে দেয়।
১৯৮৮ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর বাংলা সাহিত্য পরিষদ প্রতিবার ২১শে ফেব্র“য়ারিতে প্রকাশ করে ‘এখানে একুশ’ নামে সাহিত্য স্মরণিকা। আহমেদ ময়েজ এবং দিলু নাসেরের সম্পাদনায় ১৯৯৯ সাল থেকে পরপর কয়েক বছর প্রতি ২১শে প্রকাশিত হয় বিলেতের কবিদের হাতের লেখা চমৎকার কবিতার সংকলন ‘একুশের সাক্ষর’। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে অনেক উন্নতমানের সাহিত্যের ছোট কাগজ। যা দিনে দিনে এখানের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। নব্বইয়ের পর থেকে বিলেতে প্রকাশিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি সাপ্তাহিকী। এগুলোতে মাঝে মাঝে কিছু গল্প কবিতা প্রকাশিত হয়। তবে খুব অগোছালোভাবে সাহিত্যের পাতাগুলো দেখলেই চোখে ভাসে অযতেœর ছাপ। বিভিন্ন বিশেষ দিন যেমন একুশে ফেব্র“য়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ঈদ, নববর্ষের কাগজগুলোতে কর্মরত ডিজাইনাররা যত্রতত্র কিছু গল্প কবিতা ছেপে নিজেদেরকে বাংলা সাহিত্যের সেবক হিসেবে জাহির করেন। ১৯৯৯ থেকে ছড়াকার-কবি আহমেদ ময়েজের হাত ধরে বিলেতের সাপ্তাহিক কাগজের সাহিত্যপাতায় আসে নতুনত্বের ছোঁয়া। তিনি বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি কাগজের সাথে জড়িত ছিলেন এবং তার মাধ্যমে সংযোজিত হয় কাগজ গুলোতে সাময়িকীর। প্রথমে সাপ্তাহিক সিলেটের ডাকে এবং পরে সুরমায় সৃজনশীল সাহিত্য পাতা প্রকাশ করেন। এরপর নতুন দিনেও আহমেদ ময়েজ প্রকাশ করেন সাধ্যানুযায়ী উন্নত সাহিত্য পাতা। অন্যান্য কাগজগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক পত্রিকায় দেশের এবং বিলেতের লেখকদের লেখা যতœসহকারে ছাপা হয়। তবে নিয়মিত ভাবে সাহিত্য প্রকাশের কোন উদ্যোগ নেই। গত কয়েক বছর ধরে এখানে নিয়মিতভাবে যে কাগজটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হয় সেটি হচ্ছে সাপ্তাহিক সুরমা। নিদ্বিধায় বাংলাদেশের অনেক সাহিত্য সাময়িকীর চেয়েও অনেক উন্নত, পরিচ্ছন্ন এবং সুখপাঠ্য। সুরমার এই সুবিনস্ত পাতা দেশে বিদেশে প্রশংসিত।
সুরমার সাময়িকীর মতো অন্যান্য কাগজগুলোও যদি নিয়মিত মানসম্পন্ন সাহিত্যপাতা প্রকাশের উদ্যোগ নেন তাহলে বিলেতের বাংলা সাহিত্যের চাষ আরো বেগবান হবে।

সাহিত্যের ছোট কাগজ
সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকা ছাড়াও গত কয়েকবছর ধরে বিলেত থেকে নিয়মিত অনিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি বর্ণাঢ্য সাহিত্যের কাগজ। যারমধ্যে  শব্দপাঠ,  ভূমিজ, ধীশ্বর, আদি, কাকতাড়ুয়া এবং কবিতা অন্যতম। এসব কাগজের মধ্যে বিলেতের লেখকের চেয়ে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বঙ্গের লেখকের লেখার সংখ্যা বেশী। সাম্প্রতিককালে বিলেতে বাঙালি লেখা এবং লেখকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এদেশ থেকে প্রকাশিত ঝকঝকে সাহিত্যের কাগজগুলোতে অনেক লেখকের অনুপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ‘শব্দপাঠ’ এবং ‘কবিতা’ কাগজ এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। বাকীগুলো প্রথম সংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ। আশাকরি আগামীতে এসব কাগজগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হবে এবং বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় চারণ ভূমি বলে খ্যাত বিলেতের বাংলা সাহিত্যকে প্রতিনিধিত্ব করবে।
আরো দুটি সাহিত্য উল্লেখযোগ্য সাময়িকী বিলেত থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। একটি হচ্ছে তৃতীয় ধারা অন্যটি হচ্ছে কৃষ্টি। এপর্যন্ত পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে তৃতীয়ধারা। সাহিত্য নির্ভর এই কাগজটি সম্পাদনায় আছেন তরুণ লেখক আকাশ ইসহাক। তৃতীয়ধারার প্রথম সংখ্যায় সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন সাঈম চৌধুরীও। তৃতীয় ধারার প্রত্যেকটি সংখ্যা দেশ বিদেশে সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি বিশেষ ভাবে কেড়ে নিয়েছে। এতে বিলেতের লেখকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত শক্তিমান লেখকের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। সেসব লেখা এবং প্রকাশনা দিনদিন বিলেতের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে।
 

কবিতা ও গর্হিত আত্মহত্যা কবিতা ও আধ্যাত্মিক অপরাধ কবিতা ও কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার

29/08/2009 02:50

কবিতা ও গর্হিত আত্মহত্যা
কবিতা ও আধ্যাত্মিক অপরাধ
কবিতা ও কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু


কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার একজন আত্মবিধ্বংসী কবি ছিলেনÑ এ কথাটি উচ্চারিত হওয়া অনেক বিস্ময়কর এ জন্যে যে, বাংলা ভাষ্যে জীবনানন্দ দাশ-এর পরে যে ক’জন আত্মবিধ্বংসী কবির নাম উচ্চারিত হতে পারে, তা নিতান্তই অঙ্গুলিমেয়। জীবনানন্দ দাশ-কে আত্মবিধ্বংসী ধারার প্রাগর্থী কবি ধরে নিলে পরবর্তী যে সকল কবিদের সঙ্গে কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার-এর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার দাবী রাখে তারা হলেনÑ আবুল হাসান, বিনয় মজুমদার, সাবদার সিদ্দিকী, বিষ্ণু বিশ্বাস, শোয়েব শাদাব, ফাল্গুনি রায়, অসীম কুমার দাস প্রমুখ। অকাল প্রয়াত কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার-এর জীবদ্দশায়ই তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ (সুষম দৃষ্টিতে, প্রথম প্রকাশ- সেপ্টেম্বর ১৯৭৯, সংঘর্ষ: আলো-অন্ধকার, প্রথম প্রকাশ- ফেব্র“য়ারী ১৯৮৯, ছায়া শরীরীর গান, প্রথম প্রকাশ- ১৯৯৭, পাখীর রাজার কাছে, প্রথম প্রকাশ- অক্টোবর ২০০১, চিবোয় প্রকৃতি, প্রথম প্রকাশ- ২০০২, প্রবন্ধত্রয়ী, প্রথম প্রকাশ- ডিসেম্বর ১৯৮৯) একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং দুই শত চৌত্রিশটি অপ্রকাশিত কবিতা নিয়ে রচনা সমগ্র বের হয়। ফলে কিশওয়ার-রচনা একত্র-পাঠের সুযোগ হওয়ায় নতুন করে পাঠকীয় জিজ্ঞাসা তৈরী হয়েছে অথবা গ্রহণ-বর্জন স্পৃহা ঘনবদ্ধ হয়েছে বিবিধ প্রযতেœ। সংঘর্ষ: আলো-অন্ধকার গ্রন্থে যে কবির শক্তিমত্তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়, তৎপরবর্তী অসংখ্য রচনায় তা খন্ডিত এবং ক্রমে খর্ব হয়ে যেতে দেখি; বিশেষ করে হামদ, না’ত সহ অধিবিদ্যাকেন্দ্রীক কবিতাগুলো অনেক দূর্বল এবং গতানুগতিক। কিশওয়ার-এর রচনা সমগ্রে তাঁর কোনো গল্প সংকলিত হয়নি। ‘রানুর অন্তিম পাঠ’ শিরোনামক গল্পটি বাংলা কথা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বললে অত্যুক্তি হবে না। এ আলোচনায় কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার এর সকল রচনা এক পাশে রেখে তাঁর রচিত একটি মাত্র কবিতায় অনুধ্যায়ী হতে চাই এবং তৎপূর্বে আত্মবিধ্বংসী ধারণাটি ব্যাখ্যাত হওয়ার দাবী রাখে।

একজন্মে মানুষ কি কবিতা লিখতে পারে? মানুষ কবিতা লেখে মৃত্যুর পরে। Ñ অন্তরাত্মার এই অসহায়ত্ব ধারণ করে মানুষ কবিতা নির্মাণ আয়ত্ব করেছে, এ এক বিস্ময়কর বিষয়। আর সর্বাধিক বিস্ময়কর হলÑ মানুষ নির্মাণ করছে আত্মবিধ্বংসী কবিতা, আত্মা ও আত্মউন্মোচনের তীব্রতা থেকে। এ যেনো অলৌকিক কবিতা, লৌকিকতা অস্বীকার করে নয়, ত্রিশ দশকের আধুনিক বাংলা কবিতার অত্যুজ্জ্বল প্রতিনিধিত্বই নয়, বরং পৃথক আত্মা নিয়ে পৃথক যুগ-চেতনা, ঐতিহ্যে, পান্ডিত্যে সণাক্তযোগ্য ও সয়ম্ভূ। আত্মবিধ্বংসী কবিতা লঘু-চেতা কোনো সন্নাসীতত্ত্ব নয়, আবার চূড়ান্ত বাউলীয়ানা অস্বীকার করে নয়; পান্ডিত্যপূর্ণ অথচ পান্ডিত্যে নুব্জ্য নয়। কবি যেনো মহাসমুদ্রে এঁকে দিচ্ছেন চিহ্ন-রেখা, বাতাসে দস্তখত দিতে দিতে পাখিদের দেহ হতে মধ্যাকর্ষণ চিরে দিচ্ছেন। এ কোনো সুখী সমৃদ্ধশালী একাডেমী শিক্ষিত মিস্ত্রিবিদ্যকের কবিতা নয়। যারা আত্মবিধ্বংসী তারা আত্মজিজ্ঞাসু। শুধু তত্ত্ব আর যুক্তি দাঁড় করিয়ে গৌণ কবিদের মত তাঁরা পরিতৃপ্ত নন, বরং জিজ্ঞাসা আরো তীব্র, আরো দৃঢ়মূল হয় জ্ঞান, বিজ্ঞান, অনুভবের কেন্দ্রীয় উৎস হতে। অতৃপ্ত কবি মহাসমুদ্রে ছুঁড়ে দেন প্রশ্নবিদ্ধ সত্তার শলাকা। নিকটতম সূর্যকে হত্যা করতে চান অথবা নিজেই দৃশ্যমান হতে চান বিন্দু বিন্দু হয়ে নিজের কাছে। ঈশ্বর, নদীনালা, প্রজাপতি হত্যার মাধ্যমে বোধ করি কবি একসময় আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠেন তাঁর রচনায়, কখনো কখনো নৈমিত্তিক জীবন যাপনেও। কবি যখন চূড়ান্ত সমর্পিতÑ একটা লাল বন পিঁপড়াকে হত্যার মাধ্যমেই যেন হত্যা করা হল সারাটা প্রাণীমন্ডলী। কবির বিরোধ তৈরী হয় যাপিত জীবন, রাষ্ট্র, ধর্ম, প্রথা, রাজনীতি, অর্থনীতি, অ-কবি, গৌণ কবি সঙ্গে। সর্বকালে, সর্বভাষায়ই গৌণ কবির আধিক্য ছিল, এখন তো এমনই যে কবিতা লেখার মত সহজ আর মরীরি কাজটুকু যেন দ্বিতীয়টি নেই। ‘দ্রষ্টাÑ সে তো কবির একটি সনাতন ও সাধারণ অভিধা; আত্মিক দৃষ্টি যাঁর নেই তিনি কি কবি হতে পারেন? পারেন না তা নয়; অনেকে শুধু রচনার নৈপুণ্যের বলে কবিখ্যাতি অর্জন করেছেন; ঈশপের ছন্দোবদ্ধ প্রকরণ লিখে লা ফঁতেন, সুবুদ্ধিকে আঁটো দ্বিপদীর চুড়িদার পরিয়ে আলেকজান্ডার পোপ।

এ পর্যায়ে পঠিত হতে পারে কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার-এর ‘অস্তিত্বের শ্লোক’ কবিতাটিÑ

আমাকে হত্যা করো
প্রভুর আদেশে।

হত্যার সময়
বধ্যভূমিতেÑ
প্রভু, মৃত্যুদন্ডে করে অভিনয়।

ঘাতক।
দর্শক।
আর নিহতের
কর্তিত মস্তক,

শূন্যে হয় জল-অনল
আলোকালো সন্ত-পাপী
অস্তিত্ব ধারক।

আমাকে হত্যা করো
প্রত্যাদেশে
প্রভুকে হত্যা করো
আমার আদেশে
আমিÑ প্রভু
প্রভুÑ আমি
প্রেমের-পালক।

হৃদয়ে তোমাকে পেলে
প্রেম;

প্রাণ দিতে প্রাণ নিতে
আর প্রাণহীন হতে
শূন্যে আরো শূন্য হই
সকল সময়।

অনেকার্থব্যঞ্জক এ কবিতাটি পাঠ শেষে উইলিয়াম ব্লেইক -এর ওসধমরহধঃরড়হ রং এড়ফ অথবা শেলির ‘কবি ঐশ্বরিক’ কথাটি হয়তো স্মরণ করা যেত, আইনাল হক বা আমিই ঈশ্বর এর যোগসূত্র তৈরীর মাধ্যমে সুফীবাদী কবিতা বলে সজ্ঞায়িত করলেও হয়তো যুক্ত-তর্কের সন্নিবেশন হত। তার চেয়ে বরং ফিরে যাওয়া যাক প্রারম্ভিকতায়। অর্থাৎ আত্মবিধ্বংসী কবিতা ধারণ করে আধুনিকতা, বিনির্মাণ, কিউবিজম, যাদুবাস্তবতা, উত্তরাধুনিকতা সহ ভাবরাজ্যের সবগুলো সূক্ষèরশ্মি। কিন্তু আপন অবস্থানে সে সর্বদা স্থিরচিত্ত এবং দৃঢ়মূল। এ যেনো এক প্রার্থনার পাথর, জগতের সমূহ পাপ নিরন্তর শুষে নেয়, মানুষেরা চুম্বন করে পাপ রেখে আসে; পাথর আরো কালো হয়, গোপনে ঋব্ধ হয়। আত্মবিধ্বংসী কবিতার স্বরূপ বিশদ ভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে বুদ্ধদেব বসুর ‘ভূমিকা: শার্ল বোদলেয়ার ও আধুনিক কবিতা’য়। বুদ্ধদেব বসু যদিও বোদলেয়ারকে কোথাও আত্মবিধ্বংসী বলে চিহ্নিত করেননি, কিন্তু আত্মবিধ্বংসী বিষয়ের বীজ এত সযতনে বপন করা যা সহজেই সংক্রমিত করেÑ  ‘প্রথম দ্রষ্টা তিনি, কবিদের রাজা, এ এক সত্য দেবতা’ কথাগুলো লিখেছিলেন শতবর্ষের ব্যবধানে কোনো পুস্তকপীড়িত প্রৌঢ় পন্ডিত নন, তাঁর মৃত্যুর মাত্র চার বছর পরে এক অজাতশ্মশ্র“ যুবক, তাঁরই অব্যবহিত পরবর্তী এক কবি, আর্তুর র‌্যাঁবো, তাঁর প্রথম সন্তানগণের অন্যতম।

... ‘আমরা অনুভব করি বোদলেয়ারের চিন্ময় সত্তা, হেমন্তের ঝোড়ো হাওয়ার মতো, বয়ে চলছে সেই যৌবনকুঞ্জের উপর দিয়েÑ কুঁড়ি ঝরিয়ে, বীজ ছড়িয়ে, ফুল ঝরিয়ে, মরা পাতার মত মরা ভাবনাগুলিকে উড়িয়ে দিয়ে কয়েকটি অকালপক্ক রক্তিম ফল ফলিয়ে তুলছে।’

... ‘অদৃশ্যকে দেখতে হবে, অশ্র“তকে শুনতে হবে’, ‘ইন্দ্রিয় সমূহের বিপুল ও সচেতন বিপর্যয় সাধনের দ্বারা পৌঁছতে হবে অজানায়’, ‘জানতে হবে প্রেমের, দুঃখের, উন্মাদনার সবগুলি প্রকরণ’, ‘খুঁজতে হবে নিজকে, সব গরল আত্মসাৎ করে নিতে হবে,’ ‘পেতে হবে অকথ্য যন্ত্রণা, অলৌকিক শক্তি, হতে হবে মহারোগী, মহাদুর্জন, পরম নারকীয়, জ্ঞানীর শিরোমণি। আর এমনি করে অজানায় পৌঁছানো।’  

কবি কিশওয়ার পৌঁছেছিলেন অজানায়, এ সাক্ষ্য নির্দ্বিধায় দেয়া যেতে পারে। শুধু কবিতায়ই নয়, ব্যক্তিজীবনেও দীর্ঘদিন ভূগেছেন সিজোফ্রেনিয়ায়। আমৃত্যু লালনও করেছেন।

পুনঃর্বার পঠিত হতে পারে ‘অস্তিত্বের শ্লোক’ কবিতাটি।

আমাকে হত্যা করো
প্রভুর আদেশে।

হত্যার সময়
বধ্যভূমিতেÑ
প্রভু, মৃত্যুদন্ডে করে অভিনয়।

ঘাতক।
দর্শক।
আর নিহতের
কর্তিত মস্তক,

শূন্যে হয় জল-অনল
আলোকালো সন্ত-পাপী
অস্তিত্ব ধারক।

আমাকে হত্যা করো
প্রত্যাদেশে
প্রভুকে হত্যা করো
আমার আদেশে
আমিÑ প্রভু
প্রভুÑ আমি
প্রেমের-পালক।

হৃদয়ে তোমাকে পেলে
প্রেম;

প্রাণ দিতে প্রাণ নিতে
আর প্রাণহীন হতে
শূন্যে আরো শূন্য হই
সকল সময়।


কেন কবিতাটি পুনঃপঠিত হল? ব্যাখ্যাদান হয়তো জরুরী, হয়তো জরুরী নয়। কিশওয়ার এর অধিকাংশ কবিতায় একই জিজ্ঞাসা বারংবার ঘুরেফিরে এসেছে এবং গভীর থেকে গভীরে পৌঁছার মধ্য দিয়ে কবিতায় এসেছে অনেকার্থদ্যোতনা। কিন্তু অনেক আলোচকরাই হয়তো চাইবেন কিশওয়ারকে অস্তিত্ববাদী কবি, মরমী কবি, সুন্নী কবি, বিনির্মাণবাদী বা উত্তরাধুনিক কবি ইত্যকার মুখস্থ শব্দরাজির মাধ্যমে সিদ্ধান্তের সনদ দিয়ে দিতে। কিন্তু চিহ্নিত না করেও যে কবিতা পাঠ বা কাব্যালোচনা সম্ভব এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ না করাটাও যে একটা কাজ এ বিষয়টি আমাদের বোধের অতীত রয়ে গেছে ঐতিহ্যগতভাবে। এখন জিজ্ঞাসা  তৈরী হতে পারেÑ আত্মবিধ্বংসী ধারণা কি কবিকে চিহ্নিত করার নিমিত্তেই উচ্চারিত হয়নি? উল্লেখিত হওয়া জরুরীÑ আত্মবিধ্বংসী শব্দটি নিজ হতে নিজে সংজ্ঞায়িত না হয়ে বা কোনো বিষয়কে সংজ্ঞায়িত না করে বরং বিষয়টিকে অনুধাবনের জন্য পদ্ধতিগতভাবে বোধের নিকটপ্রতিবেশী হতে সহায়তা করছে মাত্র। আত্মবিধ্বংসী কবিতায় কী কী উপকরণের  অস্তিত্ব নেই তাও বিশ্লেষ্য। ‘অদৃশ্যকে দেখতে হবে, অশ্র“তকে শুনতে হবে, ‘ইন্দ্রিয় সমূহের বিপুল ও সচেতন বিপর্যয় সাধনের দ্বারা পৌঁছতে হবে অজানায়। ফলে পাঠককেও ক্ষমতা অর্জন করতে হবে রচনার সঙ্গে সহযাত্রার। ‘সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী’ এ জাতীয় আরামদায়ক, পরিকল্পিত, তৃপ্তিকর এবং গ্রামীণ আবহে ভরপুর কবিতা পাঠে যারা অভ্যস্থ তাঁদের অনুভবের মাপঝোঁকে আত্মবিধ্বংসী কবিতা জায়গা না হওয়ার বহুবিধ কারণ আছে। উত্তরাধুনিকতা চর্চার লক্ষ্যে কিংবা শুধুমাত্র কাব্যভাষা অর্জনের নিমিত্তে আত্মবিধ্বংসী কবিতা আঞ্চলিক শব্দে ভরপুর নয়, অর্ধবোধের ভেতর থেকে বাউল ঘরাণার বিনির্মাণও নয়, আরোপিত লোকপুরাণ, ধর্মীয় কিচ্ছা কাহিনী সহ সংস্কৃত, উর্দুসহ বিদেশী শব্দের বাহাদুরীও নেই তাতে। আর কী কী উপকরণ অনুপস্থিতÑ এ বিষয়ে আত্মবিধ্বংসী ধারণাটি অচেতন নয়, বিপর্যয় সাধনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে সচেতন।

কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার এর কবিতায় একই জিজ্ঞাসা বারবার ঘুরে ফিরে উচ্চকিত হওয়ায় এখন কি জাক দারিদাকে অনুসরণ করে বলবÑ কবিরা শুধু পুনরাবৃত্তিই করেন। আমরা কি অলংকারশাস্ত্রজ্ঞদের মত বলতে পারিÑ পুনরাবৃত্তি হল লেখক হিসেবে চিহ্নিত বা সনাক্তযোগ্য হওয়ার সনাতন কৌশল! বরং স্মরণ করা যেতে পারেÑ ঞযব য়ঁবংঃরড়হং, ড়হপব ধংশবফ, ংববস হবাবৎ মড় ধধিু. মানবমনে যে জিজ্ঞাসা একবার উদিত হয় তা কখনোই হারিয়ে যায় না। হারিয়ে না যাওয়া বা হারিয়ে না-ফেলার বদলে কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার আমৃত্যু জিজ্ঞাসার ক্রমবর্ধন করেছেন, বিধায় তিনি আত্মপ্রচারিত গৌণ কবিদের মত সুখী সমৃদ্ধশালী হাজার হাজার নির্বোধের তালিকায় নিজকে অন্তর্ভূক্ত করেননি। তিনি মৌলিক কবি। তিনি কবি।

সংযোজন:
অমৃতপুত্র কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার হে ঘনবদ্ধ কবি...

‘পিতৃ-পৃথিবী ছেড়ে কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার প্রস্থান করেছেন।’ এ বাক্যটি আমাকেও একদিন নির্মাণ করতে হবে, ভাবিনি। আবার ভাবছি, আমার মৃত্যু হলে কী রকম শব্দ বিন্যাসে কবি কিশওয়ার এ বাক্যটি রচনা করতেন? কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারের মৃত্যু সংবাদ শুনে ভার্থখলার বাড়িতে জমায়েত হয়েছেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ফুল-ফল বিক্রেতা, কোরানে হাফিজ, মোহাদ্দেস সহ অনেকেই। স্টেশন রোডের মাংস বিক্রেতা কসাইটি যখন কিশওয়ারের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কলিমা পড়ছিল, মুহুর্তে মানুষটিকে একজন পিতার অধিক মনে হয়েছে কবি দিলওয়ারের। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কবি দিলওয়ার আমাকে বলেন- গত বুধবারও কিশওয়ার তোমার কথা আলাপ করেছে। আগামীকাল বাদ জোহর কিশওয়ারের নামাজে যানাজা। তার জন্য প্রার্থনা করো। তৎক্ষণাৎ মনে হলÑ সন্তানের দাফনা দিতে গ্রাম-ভার্থখলায় প্রাচীনতম সূর্য উঠিয়াছে। কে তুমি অমৃতপুত্র, অলৌকিক কবি? এ জিজ্ঞাসা নিয়ে ক্ষণিক দাঁড়িয়েছে নয়াবন্দরমুখী সুরমার জল। পূনঃর্বার মনে হয়, কীনব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের কিশওয়ার সূর্যকে শাসন করছেন এবং একসময় ব্রীজ ও বাজপাখি অতিক্রম করে মিশে যাচ্ছেন জিন্দাবাজারের কোলাহলে।

কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার মারা গেছেন কয়েক ঘন্টা হলো- আমি এখনো কোনো প্রার্থনা-বাক্য খুঁজে পাইনি। কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার মারা গেছেন কয়েক ঘন্টা হলÑ আমি এখনো তাঁর মৃত্যু সংবাদ বিশ্বাস করতে পারিনি। তবে, স্রোতের মতো কয়েকটি লাইন আমাকে ছানবিন করে সয়ম্ভূ হয়Ñ

মরে গেলে, ঝরে গেলে
এ নাম স্মরণ করে
পাথরের ফুল ছুঁড়ে দিও।

দীর্ঘদিন আগে কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার এ চরণগুলো লিখে আমাকে একখানা বই উপহার দিয়েছিলেন। বছরখানেক আগে, যখন বাংলাদেশে যাই, স্ব-রচিত গ্রন্থখানি তাঁর হাতে তুলে দেয়ার মুহূর্তে লিখে দেই-

মৃত্যুর পরে
আমায় ভাসিয়ো জলে
স্থলের সৌরভ।

কিশওয়ারকে বলি- এতো মরে গেলে, ঝরে গেলে চরণগুলোরই বিনির্মাণ। কিশওয়ার হাসেন। তার হাসি সর্বদা স্বর্গীয়।

২.
কবি হিসেবে কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার কত-ভূম অতিক্রম করেছেন, সে বিষয়ে আপাতত অনুধ্যায়ী হতে চাই না। তবে তিনি যে বড় কবি, এ অনুভূতি দীর্ঘদিন ধরে স্থিত হয়ে আছে, গহন বোধে।। মনে পড়ছে, আশির দশকের শেষ প্রান্তে আমাদের শহরের ক্যাসেটের দোকানগুলোতে যখন কবিতার নামে নীরার শাড়িগুলো উড়তো, তেত্রিশ বছর কেটে গেল কিংবা কষ্ট নেবে কষ্ট... এ জাতীয় শ্লোগানচারিতায় সয়লাব; শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ছড়াকাররা যখন যত্রতত্র হট্টগোল করত তখন আমি এবং আমরা উন্নাসিক হই; কিশওয়ারের কবিতা পড়ে শুধু বিস্মিতই হই না তার বন্ধু ও পাঠক হয়ে উঠি। মনে পড়ে, কিশওয়ার-গ্রন্থের বিজ্ঞাপনের ভাষাটিও ছিল অত্যাশ্চর্য। সিলেটের বেশ ক’টি কাগজে একসাথে ছাপা হয়েছিল। ‘বেরিয়েছে, ত্রিকাল অন্বেষী কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারের কাব্যগ্রন্থ সংঘর্ষ: আলো-অন্ধকার’। ঐ বয়সে মনে হয়েছিল, কিশওয়ার যদি একাই ত্রিকাল নিয়ে যান আমি তা হলে কোন কালের কবি হব? ত্রিকালদর্শী হব? আশির দশকের প্রান্ত প্রজন্মের রাগী আর ভরাট কণ্ঠের কবি হব? হায় স্মৃতি! আজ বড় কান্নাজাগানিয়া।

কুড়ি বছর আগে প্রথম যখন কবি কিশওয়ারের সঙ্গে আমার পরিচয়, তখন আলাপচারিতার বিষয় ছিল অস্তিত্ব, ধর্ম, মৃত্যু, যৌনতা, কবিতা...। বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রযতেœ। ইমাম গাজ্জালী, স্পিনোজা, ফ্রয়েড, লাইবনিজ, গৌতম বৌদ্ধ থেকে শুরু করে কবি দিলওয়ার পর্যন্ত আলোচিত হয়েছেন।
আমি দেশ-দেশান্তরী হই প্রায় দেড়-যুগ হল। কবি কিশওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলেও মাসে অন্ততঃ একবার আমাদের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। ধর্ম, যৌনতা, কবিতা... সেই বিশ বছর আগেকার সমান বিষয়গুলোই ঘুরেফিরে এসেছে। বোধ করি ঐ একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালে তিনি আমাকে স্পষ্ট দেখতে পেতেন, আমিও তাঁকে অনুধাবন করতে সক্ষম হতাম। গত বছর সিলেটে যখন তার সঙ্গে দেখা হয়, শামস্ নূর এর প্রিন্টিং প্রেস থেকে বেরিয়ে বলি- চলুন, ভাল কোনও রেস্তোরায় বসি; রাতের আহার একসাথে করবো। জিন্দাবাজারে বিদ্যুৎ চলে যায়। কবি বলেন- রয়েল হোটেল কমদামী হলেও খাবার এবং বসার জায়গা ভাল। ঘরোয়া পরিবেশ। আলো-অন্ধকার আর জনস্রোত ঠেলে আমরা হাঁটতে থাকি এক পরাবাস্তব সড়কে। সামনেই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের গলি, রয়েল হোটেল দুই কাঁইকের পথ!

মৃত্যু, যৌনতা, কবিতা নিয়ে যতবার আমরা আলাপ করি, সমান বিষয় নতুন করে দ্যুতিত হয় এজন্যে যে, এ জিজ্ঞাসা প্রতিটি মানবের জন্য মৌলিক, চিরন্তন ও শাশ্বত। মৌলিক বিষয় কখনো ফ্যাকাশে হবার নয়। আমি স্মৃতি থেকে তার কবিতা উচ্চারণ করি-

আমাকে হত্যা করো
প্রত্যাদেশে
প্রভূকে হত্যা করো
আমার আদেশে
আমি প্রভূ
প্রভূ আমি
প্রেমের পালক।

আমি ইংল্যান্ডে বণিকবৃত্তি অথবা দস্যুবৃত্তি করি এবং ইতোমধ্যে তিন সন্তানের জনক হয়েছি শুনে কিশওয়ার বিস্মিত হন, আর আমি বিস্মিত হই, চরণগুলো নির্মাণের জন্য মানবমন্ডলী হতে কবি কিশওয়ারকেই নির্বাচন করেছে প্রকৃতি। আমরা ধূমপান করি; একটার পর একটা সিগারেট ছাই করি। দেহের উপর বড় অত্যাচার হচ্ছে, আমরা আফসোস করি। ‘আমার এ জীবন সন্ন্যাসীর থেতলে যাওয়া শিশ্নের মত’ অথবা ‘হায় হাওড়া ব্রীজ, লোহার ব্রেসিয়ার’। আত্মবিধ্বংসী কবি সাবদার সিদ্দিকীর কয়টি চরণ প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসে। বন্ধুবর বদরুল হায়দার, সরকার মাসুদ প্রমুখদের জীবন বৈচিত্র নিয়ে কথা বলেন। কিশওয়ারের মতে, এরাও কম আত্মবিধ্বংসী নন।

আমি বলি- যারা অধূমপায়ী, বড় বেশি সামাজিক, স্বাস্থ্যবান তাদের রচনা পড়লেই স্থূলতা বুঝা যায়। প্রতিটি চরণই মনে হয় পূর্ব-পরিকল্পিত। তারা মূলতঃ কলিজা-চিপে নির্যাস নিংড়াতে জানে না। তাদের কবিতা ফ্যাকাশে; বাওতা বিস্কুটের মতো- না খাওয়া যায়, না ফেলা যায়। আমরা সমস্বরে হাসাহাসি করি। রয়েল হোটেলের পাতলা আলোয় তাঁর চোখ চিকচিক করে। বেয়ারা পানদান নিয়ে আসে। জর্দা মাখিয়ে এক খিলি পান খাওয়ার জন্য শুধালে কিশওয়ার বলেন- দিনে দশ বারোটি টেবলয়েড/ক্যাপসুল খেতে হয়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দাঁতের জোর কমে গেছে। আমার বুক হো হো করে। মানুষের হাড়েরও ক্ষয় হয়! এতো হাড় নয়- কাঁটা খঞ্জর! কিশওয়ার বলেন, মৃত্যুর পরে আমার মনে হয় মানবের কোনও ক্ষয় নেই; শুধু মুক্তি, অবিরাম যন্ত্রণা থেকে। মৃত্যুর পরে শুধু ভোর আর ভোর, অনন্ত ভোর...

৩.
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ইস্পাতের গোলাপ’এর উপর একটি আলোচনা লিখেছিলেন কিশওয়ার এবং তা প্রকাশ করে পত্রিকার কপিটি কবি বন্ধু শামস্ নূর এর কাছে রেখে আসেন, যেন আমার হাতে এসে পৌঁছায়। সাক্ষাতে তাকে জিজ্ঞাসা করি আমার কবিতা প্রসঙ্গে। কিশওয়ার সময় নেন। যদিও তিনি স্বল্পভাষী, কিন্তু যখন বলতেন খনন করে কথা বলতেন। আমার কাছে যা ওহঃবহংরভরবফ ংঢ়ববপয. কিশওয়ার প্রতিউত্তরে বলেনÑ আপনার কবিতা সংক্ষিপ্ত এবং ক্ষুদ্রাকৃতির যা শক্তিমত্তা ধারণ করে আবার সীমাবদ্ধতাও লালন করে। আমি বলি- জৈষ্ঠ মাস, আষাঢ় মাসের বর্ণনা লিখে কবিতা এখন আর এই বয়সে এসে দীর্ঘ করা যায় না, এখন মহাবিশ্বকেই একটা সরষে দানার মতো মনে হয়, লাই বিছরায় বসে থাকা কালো পেচকুন্দা পাখিটির নাম হচ্ছে পৃথিবী। দীর্ঘ কী করে লিখবো!

এরকম ব্যাখ্যা কবি কিশওয়ারের জন্য তৈরী করতে ভাল লাগতো অথবা কিশওয়ারই আমাকে চিন্তার বহুব্যঞ্জণায় উদ্বুদ্ধ করতেন। যখন তিনি বলতেন যথার্থ শব্দ নির্বাচন করে বলতেন; বিধায় তাঁর আঞ্চলিক জবানীও আমার কাছে মনে হতো সর্বরাষ্ট্রিক, সর্বভাষিক এবং সর্বগৌত্রিক। তাঁর কাছে আমার শব্দ এবং চিন্তা-ঋণ অনেক।

স্বভাবে সন্ত, ঋষি প্রকৃতির এ লোকটির মাঝে পান্ডিত্যের কোনও বদহজম ছিল না। কোনও কথা বলার আগে অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে বলতেন। পান্ডিত্য নিয়ে যুদ্ধ কিংবা উল্মলম্ফের বদলে জানা-বিষয়কে অনুভূতির গভীর স্তরে নিয়ে যেতেন এবং যা বলতেন- নতুন এক সত্য মনে হত।

কবিতা লিখছেন?
কিশওয়ারের প্রতিউত্তর-
-লিখছি।
বেঁচে থাকার জন্য
কবিতাই আমার একমাত্র অবলম্বন।

৪.
(৯/১২/২০০৬) আজ বাদ জোহর কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারকে ভার্থখলাস্থ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে। আজ ইরাকের সালাউদ্দীন নগরীতে চল্লিশজন মানুষ বন্দুক যুদ্ধে মারা গেছেন। পৃথিবীর সব মৃত্যুই যেহেতু সমান এবং মানব মাত্রই যেহেতু আমারই খন্ডাংশ, আমিও সবার কবরে শুয়ে আছি, সীমাবদ্ধতা হেতু এ দৃশ্য আপাতত অন্তরে দেখি না। বরং দেখি, লাল আসমানে কালো কালো বাঁশঝাড়গুলো উড়ছে আর বরাকের ঐপারে কুয়াশায় ভিজে যাচ্ছে ভার্থখলা গ্রাম। আমি শুয়ে আছি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারের সমান সিন্দুকী কবরে। আমাদের মেদ, মাংস সব ঝরে যাচ্ছে আর মহাকালের ভেতর তিরতির করছে কয়গাছা শক্ত হাড় অথবা কিশওয়ারের কবিতা ও কঙ্কাল...


 

কবিতা প্রসংগ

29/08/2009 02:46

কবিতা প্রসংগ
- মাসুদ আহমেদ

   কবিতার সংগে আমাদের পরিচয় ঘটে মাতৃক্রোড়ে। জন্মলগ্নের নাতিদীর্ঘ সময়ের পরে, তখনো বোধের উন্মেষ ঘটে নি, মাতা এবং সন্নিবেশিত মহিলাবৃন্দ আশ্রয় গ্রহন করেন কবিতাধর্মী বাক্যাবলীর। কবিতাশ্রয়ী এই আলাপন আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় পরবর্তীতে পূর্নাবয়ব কবিতার।

    শিশুর কর্নে ধ্বনিকেন্দ্রিক দ্যোতনা এবং শব্দের মিল একটি আকর্ষনের সূচনা করে। কবিতা হয় তার আগামী জীবনের যোগাযোগের মূলসূত্র। অজানিতভারে শিশুর মনে র্সৃষ্টি হয় কবিতার প্রতি সহনশীলতা, আগ্রহ এবং এবং এই প্রক্রিয়ায় সাড়া দেবার জন্য একাত্মবোধ। অবচেতন মনে কবিতার প্রতি এই আগ্রহবোধ সুষ্টি কেবলমাত্র আমাদের দেশেই নয়, পুথিবীর সর্বত্রই এই প্রক্রিয়ার প্রয়োগ ঘটে। ঘুমপাড়ানি গান, ভিন্নদেশের লুলাবাই শ্রবনের পর্ব শেষ হলে শিশু যখন উচ্চতর বয়োসীমায় প্রবেশ করে, তখন বালক-বালিকাদের ছড়াপাঠ, ছোটদের কবিতা আবৃত্তি তাদের গুরুজন লালিত পরিমন্ডলে হয় মেধা-আশ্রিত উকর্ষতার পরিচায়ক। এসব উৎসাহ-উদ্দীপক উপস্থাপন বিদ্যাপীঠের অনুষ্ঠানে নয়, নিজগৃহে, আত্মীয়-পরিমন্ডলে গর্বিতা মাতা পুত্র-কন্যাকে উপহার দিতে বলেন সদ্য অনুশীলিত ছড়া বা কবিতাটি। প্রসংশিত তনয় বা তনয়ার মনের গহীনে কবিতার প্রতি আন্তরিক আগ্রহের সূচনা করেন পিতামাতা।

    বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে অন্যান্য কর্মকান্ডের আধিক্যে, আপাত:ভ্রম হতে পারে যে কবিতা বুঝি অপসৃয়মান। বুঝি বিদ্যার্জনের প্রভূত প্রচাপ কবিতাকে শিক্ষাগত পাঠ এবং অনুধাবনের মধ্যে সীমিত করে রাখে। এদের মধ্যে ব্যতিক্রম, ভবিষ্যতের কবিবৃন্দ যারা বিদ্যাভাসের পাশাপাশি সংগোপনে কবিতার আরাধনা অব্যহত রাখে।

    পাশ্চাত্যের জনৈক প্রখ্যাত কবি কবিতার সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে বলেছিলেন.-”চড়বঃৎু রং ঃযব ংঁঢ়ৎবসব ভড়ৎস ড়ভ বসড়ঃরাব ষধহমঁধমব”। তদর্থে কবিতা হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম আবেগপ্রত’ত ভাষা। আবেগ বা তীব্রানুভূতির প্রাবল্য ঘটলে, যৌবনে দয়িতাকে নিয়ে নিয়ে কবিতা রচনা করেন নি বা কবিতার চতুর ব্যবহার করেন নি এমত প্রেমিকের সংখ্যা বিরল। বাংলাদেশের পরিবেশে মহাবিদ্যালয়ের সহপাঠিনী  অথবা প্রতিবেশিনীর কাছে প্রেরিত লিপিখানি উল্লিখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী কবিতা বলে গৃহীত হতে পারে। বিশেষ করে যখন আধুনিক বাংলা কবিতায় গদ্যকবিতার প্রবাহ চলমান।

    অন্য এক প্রখ্যাত কবি বলেছিলেন,- কবিতায় তিনটি গুন অবশ্যই বর্তমান থাকতে হবে। এই তিনটি গুন হচ্ছে,- “গবষড়ঢ়রধ, ঢ়যড়হড়ঢ়রধ, ষড়মড়ঢ়রধ,-ঃড় পযধহঃ, ঃড় ংরহম ধহফ ঃড় ংঢ়বধশ”। কবিতায় থাকতে হবে, মান্ত্রিক তন্ময়তা, সংগীতের মন্ময়তা এবং একটি বক্তব্য বা বাণী। এই সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে কবিতার অবদান আরো সুসংবদ্ধ এবং সুললিত হওয়া অপরিহার্য্য। বাংলাসাহিত্যের ইতিত্তৃত্তে প্রাচীন কবিতাবলীতে এই ধারনাবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ কবিই তাদের রচনাশৈলীতে এই ত্রয়ী গুনগত বৈশিষ্টের ব্যবহারে ক্রিয়াশীর ছিলেন। বলা যেতে পারে এই ধারা মোটামুটিভাবে বাংলা সাহিত্যের কবিতায়  বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ দশক পর্য্যন্ত বহমান ছিলো।

    চল্লিশ দশকের পরবর্তীকালে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে কবিতায় এসেছে একটি মহা পরিবর্তন। পূর্বে ছন্দ ও মিলের নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে বক্তব্য বা বাণীকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হোতো। প্রাচীনকালে শ্লোক, দোহা ও মূলস্রোতের কবিতার মধ্যে কবির উপস্থাপনার মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন বাণী সতত সমুপস্থিত ছিলো। ভগবত প্রেম, প্রকৃতি বন্দনা, ধর্মীয় অনুশাসন বা সামাজিক ক্রিয়াকর্মের নৈতিক বিধিমালা পাঠক-পাঠিকার কাছে পৌঁছে দেবার দায়দায়িত্ব ছিলো যুগোপযোগী । পয়ার, মাত্রা ও ছন্দের মোহনীয় আচ্ছাদনে আবৃত কবিতা পাঠত-পাঠিকাতে প্রভাবিত করে বলে শাসক বা রাজ দরবারে নিয়োগপ্রাপ্ত কবির দায়িত্ব শুধুমাত্র নৃপতিকে আনন্দ দান নয়, তার অলিখিত দায়িত্ব ছিলো জনসাধারনকে প্রভাবিত করাও।

    প্রাক কল্লোল যুগে এবং বাংলা সাহিত্যের মহাধিপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যে আছে বিশ্বপ্রেম, সৌন্দর্য্যবোধ, মানবপ্রেম ও সার্বজনীনতা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতায় এলো মহা আন্দোলন। এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ কবিতায় দেবত্ব-বন্দনার বদলে এলো সাধারন মানবতার কথা। কবিতায় রচিত হোলো অত্যাচারিত নির্য্যাতিত মানুষের কথা, তদসংগে তাদের সংগ্রামের কথা। বলা যেতে পারে, এ ব্যাপারে বাংলা কবিদের নেতৃত্ব প্রদান করেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অবশ্য তার ব্যপ্তি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বহু পর পর্য্যন্ত বিস্তারিত হলেও, তার সূচনা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেই। যে জনসাধারন একদা নতমুখে ললাটঙ্ক লিখন বলে ভাগ্যকে মেনে নিয়ে ঈশ্বর ও শাসকগোষ্ঠির সকল নির্দেশ গ্রহণ করতেন, বিদ্রোহী ক্িব কাজী নজরুল ইসলাম তাদের হাতে বিদ্রোহের বজ্রপতাকা তুলে দিলেন। যে কবিতা ছিলো কাব্যরসিকের একান্ত রসাস্বাদনের উপপাদ্য, তা সহসা এই নব্যধারার কবিদের বদৌলতে জনসাধারনের হাতে হয়ে উঠলো যে কোনো অন্যাযের বিরুদ্ধে উদ্যত হাতিয়ার। বিদ্রোহী কবির অগ্নিবীনার সুরে উজ্জীবিত অবিভক্ত ভারতবর্ষের আপমর জনসাধারন শিখলো জীবনের নব মূল্যায়ন। একার্থে বলা যেতে পারে কবিতা কেতাবী উচ্চাসন থেকে নেমে  এলো পদাতিক জনতার কাছে। কবিতায় এলো রাজনীতির ব্যবহার।

    কবিতায় ব্যবহারিক আটপৌরেতার কারনে তার মধ্যে কায়িক পরিবর্তনও ঘটলো প্রভূত। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, পয়ার ও ছন্দের আগল ভংগ করে শুরু হোলো সাধারন মানুষের কথিত ভাষার অনুরূপ ভাষা ও বাক্য প্রয়োগে কবিতা রচনা। কবিতা হোলো আরো বলিষ্ঠ, গদ্যময় ও জনপন্থী।  এদের মধ্যে অন্যতম ব্যতিক্রম, কবি মোহিতলাল মজুমদার। অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক কবির কবিতা গদ্যময় হলেও, বাক-প্রতিমা, চিত্রকল্প এবং উচ্চমার্গ শব্দের ব্যবহারবলী তার জন্য বাংলাসাহিত্যে একটি আলাদা স্থান নিশ্চিত করেছে।

    কল্লোল যুগ আমাদেন বাংলা কবিতা প্রসংগে একটি বিস্ময়কর অধ্যায়। কল্লোল যুগের কবিবৃন্দ অনন্য জীবনবোধের দহনে নিয়ত জ্বলেছেন। আর সেই অগ্নিশুদ্ধ বোধেউচ্চারিত পঙক্তিমালায় সজ্জিত করেছেন কাব্যের মানসীকে। অনাদিকালের মানব-মানবীর প্রেমকথা যেমন নতুনতর বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞায় বিবৃত হযেছে তাদের কবিতায় আবার তেমনি বিংশ শতকের হতদরিদ্র মানুষের আশা-আকাঙ্খা এবং আশাভংগের নিদারুন যন্ত্রনার ইতিকথাও বিধৃত হয়েছে তাদের কাব্যে। চন্দ্রসুধা পানের পাশাপাশি ক্ষুধার্ত কবি চাঁদকে একটি পোড়া ঝলসানো রুটি হিসাবে উপস্থাপিত করতে মোটেও কুন্ঠিত নন। সুকান্ত ভট্টচার্য্যরে এই জীবন-দর্শনের সমান্তরালে জীবনান্দ দাশ রোমান্টিসিজমের নীবিড় আলিংগনে বরন করেছেন প্রকুতিকে। সূর্য্যসম রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিকে প্রায় পাশ কাটিয়ে এইসব কবিরা বাংলা সাহিত্যে নিয়ে  এলেন কবিতার ভিন্নধারার ভিন্নমাত্রিক ঐশ্বর্য্য।

    কবিতা সার্বজনীন হলেও, কবিতাকে ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে সমুপস্থিত করার প্রচেষ্টা করা হযেছে। উনিশশো সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর অবিভক্ত বংগদেশ, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে,- উপনিবেশবাদী সামগ্রিক পাকিস্তান সৃষ্টির অনতিবিলম্বে বাংলাসাহিত্যকে ধর্মের আলখাল্লা পরানোর প্রয়াস ছিলো প্রকট। ধর্মীয় বৈষমকে বৃহৎ করে প্রদর্শন করা ও  ভিন্নতর আত্মপরিচয় উদ্ভাবনের জন্য অত্যাগ্রহী পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠির বদান্যতায় বাংলা কবিতায় ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবিদের অভিযাত্রা শুরু হয়। কট্টর আপাতঃধর্মবাদী শাসকগোষ্ঠির অনুপ্রেরনায় ফররুখ আহমদের সমসাময়িক এবং অনুসারী বেশ কিছু কবির আবির্ভাব ঘটে। ফররুখ আহমেদের কবিতায় চয়িত বাকপ্রতিমার ব্যবহার, চিত্রকল্প ও ছন্দের সমাহার তার কবিতাকে রসোতীর্ন ও কালজয়ী করলেও তার ভাবধারায় অনুপ্রানিত অন্য কবিদের কবিতা অপকবিতার নামান্তর মাত্র।

    কবিতার নানাবিধ ভূমিকা আছে। কবিতার নন্দনতত্ত্ব ও চেতনাকে অন্যরূপে উপস্থাপিত করে কবিতার আবেদনকে কবিরা বহুসময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করেছেন। যেহেতু অনেকসময় এই ব্যবহার মহত্তর কারনের জন্য, এই প্রক্রিয়ার ব্যবহার শুভ, সফল এবং কালোপযোগী। উনিশশো আটচল্লিশ সালে নবসৃষ্ট পূর্বপাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার কার্জন হলে বাংলাভাষার অধিকারগত ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্পর্কে জনৈক মোহাম্মদ আলী জিন্নার কটূক্তি অজাত বাংলাদেশীদের জন্য একটি নতুন জাতীয়তাবোধের সূচনা করে। এই জাতীয়তাবোধের প্রয়োজন ছিলো জনসংযোগের জন্য একটি সর্বজনগ্রাহ্য বাহন। কবিতার চাইতে শ্রেয়তর বাহন আর কি হতে পারে?

    উনিশশো বাহান্ন সালের একুশে ফেব্র“য়ারীর শোনিতপাতে অভ্যুত্থান ঘটলো স্বাধীনতাকামী পূর্ববংগবাসীদের জাতীয় চেতনাবোধের অভিজ্ঞানের। বৈদুর্য্যরে মনি এই অভিজ্ঞানের আলোক সর্বস্তরে পৌঁছে দেবার জন্য পূর্ব বাংলার বাংলা সাহিত্যে ঘটলো কবিতার গন-বিপ্লব।

    একুশে ফেব্র“য়ারীকে কেন্দ্র করে এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গনমানসের জন্য উদ্দীপনামূলক যত কবিতা রচিত হয়েছে, দেশ বা জাতিগত গনসংগ্রামের জন্য পৃথিবীর অন্য কোথাও রচিত হয়েছে বলে জানা নেই। উপস্থিত গনচেতনাকে সংঘবদ্ধ করার জন্য, আন্দোলনের জন্য সমগ্র বাংগালী সত্ত্বাকে একত্রীভূত করার জন্য জাতীয়তাবোধের নতুন আলোকে উদ্ভাসিত বাংলাদেশের কবিরা সৃষ্টি করেছেন অনন্য কবিতাসমূহ।

    এই কাব্যকাল, ঈষৎ দ্বিধার সংগে মন্তব্য করা যেতে পারে, বাংলাদেশের কবিদের একাগ্র্রমন্যতা প্রেম-ভালোবাসা, বিশ্বপ্রেম, নৈসর্গিক দুশ্যাবলী, সার্বজনীনতা ইত্যাদি,- কবিতার প্রচরিত বিচরন ক্ষেত্র থেকে ব্যবধানের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের বাংলা কবিতার এই কালটি ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কাব্যকাল। শক্তিশালী উদ্দীপ্ত কবিদের লেখনীতে রচিত হয়েছে ভাষা ও স্বাধীনতা-কেন্দ্রিক অমর কবিতাসমূহ। কিন্তু একমুখী এই কাব্যরচনার ধারার গড্ডালিকাপ্রবাহে তাড়িত কিছু লালিত্যবিহীন শ্লোগানজাত অধোকবি ও অধোকবিতার সৃৃষ্টি করে।

    এই প্রসংগে আর একটি ব্যাপার গভীর দুঃখের সংগে অনুধাবন করা হয়েছৈ। একুশে ফেব্র“য়ারী ও মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক যেসব মহার্ঘ অনুপম কবিতাবলী রচিত হয়েছে, সেগুলি পুথিবীর অন্য প্রধান ভাষাগুলিতে অনুদিত না হওয়ায়, বিশ্বসাহিত্যে এগুলি যথার্থ উচ্চ সম্মান লাভ করতে সক্ষম হয় নি। কেবলমাত্র কাব্যশৈলীর মানদন্ডেও কবিতাসমূহ আন্তর্জাতিক সাহিত্যে মূল্যায়িত হতে পারতো। এইসব কবিতাসমূহ পৃথিবীর যে কোনো দেশে স্বাধীনতাকামী , স্বাধীকারের প্রচেষ্টায় লিপ্ত মানবের উদ্দীপনার সঞ্জীবনী মস্ত্র হতে পারতো।

    পশ্চিম বংগের কবিরা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের এই মহাঅন্দোলনের সংগে সম্যকভাবে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু তারা নীবিড়ভাবে এই সাহিত্য-বিপ্লবকে অবলোকন করেছেন। তারা আন্তরিকভাবে এবং সংর্স্কৃতি ও চেতনাগত সাহিত্য-বন্ধনের জন্য বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের প্রতি সংবেদন ও সহানুভূতিশীল। পশ্চিম বংগের সমসাময়িক বাংলা কবিতায় এর প্রতিফলন বর্তমান।
    বলাবাহুল্য, পশ্চিম বংগের কবিতার ধারা ভিন্নতর। তাদের কবিতার ধারায় বিশ্ব-সাহিত্যের সংগে স¤পৃক্ততা বেশী। বিশ্বায়নের যুগে কবিতা তথা সাহিত্য হচ্ছে মনোসংযোগের একমাত্র বুদ্ধি-মাধ্যম। এই বুদ্ধি-মাধ্যম এবং এর ব্যবহারকারী সাহিত্য-জনপদ কোনো ভৌহলিক বা সামাজিক দুরত্বকে গ্রাহ্য করে না। পশ্চিম বাংলার বাংলা কবিতা রচয়িতাদের দিয়েছে বিশ্বসাহিত্যের মহাসম্মেলনে অন্যদেশের কবিদের নৈকট্য। কিন্তু বাংলাদেশের কবিদের দিয়েছে স্বাতন্ত্রের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট।    

    ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকালের কালে, রাষ্ট্রীয় স্থিতিলাভের পরে বাংলাদেশের বাংলা কবিতায় পালে লেগেছে নতুন পবনের ছোঁয়া। বাংলা কবিতা নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে। আত্মপ্রত্যয়ী কবিরা কবিতা নিয়ে, এর আংগিক, বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা নিয়ে অধুনা পরীক্ষা-নীরিক্ষায় লিপ্ত। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামী কবিরা সাফল্য অর্জনের পর আবার নববেশে কাব্যমানসীর দুয়ারে নবসম্ভারে উপনীত।

    তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির জনসাধারন ও বুদ্ধিমত্তা নীতিগতবাবে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী। পশ্চিমা শক্তিজোটের বহু বৎসরের প্রতক্ষ্য এবং পরোক্ষ শোষন এই দেশসমূহের কবিদের অবচেতন সত্ত্বায় সুষ্টি করেছে প্রতিবাদের পরিভাষা। এই পরিভাসা রূপান্তরিত হয়েছে তাদের রচনায়। পূর্বসূরী নাজিম হিকমত, সুকান্ত ভট্টচার্য্য, ইয়েভতুশেংকো, ফেদরিকো গথিয়া লোরকা ইত্যাদির ভাবধারার অনুসারী, সত্তুর আশির দশকে বাংলাদেশের বাংলা কবিতায় আগমন ঘটেছে একঝাঁক বুদ্ধিদীপ্ত অতীব প্রাণবন্ত কবির। তাদের কবিতা শ্লোগান নয়, কিন্তু বক্তব্য এমনই সাবলীলতায় উচ্চারিত যে তা অবশ্যই অনুপ্রনিত পাঠক-পাঠিকার মরমে পৌঁছে। তাদের কবিতা মন্ময়তা আর তন্ময়তার আধারে হয়েছে আরো কাব্যাশ্রয়ী। গদ্য বর্তমানে কবিতার মূল বাহন হলেও, ছন্দ ও মিলের ব্যাপারে কোনো দায়বদ্ধতা না থাকলেও কাব্য রসিকরা পরমোৎসাহে অনুধাবন করছেন, বাংলা কবিতায় একটা বিবর্তন চলছে। এখন অনেকে আবার স্বছন্দে স-ছন্দ সমিল কবিতা রচণা করছেন। মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, পয়ার এবং আন্তিক মিলের পূর্ণবাসন ঘটছে ঠিকই, কিন্তু লক্ষনীয় যে বাক-প্রতিমা, উপম্াবলী, চিত্রকল্প, বাক্যশৈলী অত্যাধুনিক ও অতি সা¤প্রতিক। যারা গদ্য কবিতা লিখছেন, তাদের রচনায় মিলের অনুপস্তিতি ব্যতিরেকে কবিতার অন্যান্র গুনাবলী বিদ্রমান ও সমুজ্জ্বল।

    পৃথিবী এখন একটি বৃহৎ গ্রাম ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবীর যেখানে অক্ষরেখা মিশেছে দ্রাঘিমার সাথে, তা সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, সেখানে সন্দর্শন পাওয়া যাবে একজন বাংলাদেশীর বা বাংগালীর। জীবনের তাড়নায়, জীবিকার অšে¦ষনে বাংলাদেশের মানুষ আজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। আমেরিকার প্রত্যন্ত শহরে, সৌদি আরব, দুবাইয়ের কলকারখানায়. কানাডা, যুক্তরাজ্যের অলিতে গলিতে বাংলাদেশীদের অধিবাস। প্রবাসে বসতি স্থাপনের সাথে সাথে তারা সংগে বহন করে নিয়ে এসেছেন তাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। এনেছেন তাদের অন্তরংগ সম্পদ, বাংলা কবিতা। বাংলাদেশীর ধমনীতে বহমান কবিতা। কবিতার সংগে তার যে পরিচয় মাতৃক্রোড়ে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমার উচ্ছ্বলিত জলরাশি, সোনালী ধানের ক্ষেত, চট্টলার উতুংগু পর্বতমালা, বেন নেভিস, টেমস নদীর পারের প্রবাসী বাংরাদেশীদের মনে ঢেউ খেলিয়ে যায়। কর্মক্লান্ত জীবনের অবসরে প্রবাসী বাংলাদেশী আত্মমগ্ন আপন দেশের শিল্প-সাহিত্য চর্চায়। প্রবাসে আত্মসমাহিত কবি রচনা করছেন বাংলা কবিতা।                                

    বাংলাদেশের বাইরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশীদের অধিবাস বৃহত্তম। তার ফলে যুক্তরাজ্যে গঠিত হয়েছে একটি শক্তিশালী বাংলা সাহিত্য-গোষ্ঠি। বাংলাদেশের বাইরে বাংলা সাহিত্যের এই অবয়ব বাংলাদেশের সাহিত্য ও কবিতার অবয়ব থেকে ভিন্নতর। যুক্তরাজ্য কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য এর ব্যতিক্রম নয়।

    যুক্তরাজ্যের বাংলা কবিতার কতিপয় গুনগত লক্ষণ আছে। এইসব গুনগত ব্যতিক্রমী লক্ষণগুলির কারণ হচ্ছে ভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা এবং প্রবাস-মানসিকতা। প্রবাসী কবি সাহিত্যিকবৃন্দ বাংলাদেশের মূল ধারার সাহিত্যের সংগে একাত্মবোধ করলেও, তারা দূর থেকে বাংলা কবিতা তথা বাংলা সাহিত্রের ক্রমপরিবর্তনকে আরো গভীরভাবে, বিশেক্ষষনের দুষ্টিক্ষেপে অবলোকন করতে পারেন। বাংলাদেশে আপাতঃ বাক-স্বাধীনতা থাকলেও দেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের জন্য বহু রচনা প্রয়াস বিঘিœত বা নিষিদ্ধ প্রায়। যুক্তরাজ্যের কবিরা বাস করেন একটি গনতান্ত্রিক দেশে যেখানে বাক-স্বাধীনতা স্বাধীকারের মহিমায় সুপ্র্রতিষ্ঠিত। ফলে বাংলাদেশের কাব্য-সাহিত্যে যে রচনা অবদমিত ও নিষিদ্ধ-প্রায়, এ দেশের কবি সাগিত্যিকরা তা অনায়াসে ব্যক্ত করছেন। তাদের এই উচ্চকণ্ঠ রচনামালা, বলা যেতে পারে বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের নৈতিকভাবে মানসিক ও সাহসের পরিপোষক।

    সাহিত্য এবং সাহিত্য-আন্দোলন,- এ দু’টি  একেবারেই আলাদা জিনিষ। যুক্তরাজ্যে একটি দ্রুত, ধাবমান ও পরিবর্তনশীল সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়েছিলো আশির দশকে। সেই সময়ের বেশ কিছু ভারী তরুন কবি, যারা এখন প্রৌঢ় প্রায়, কবিতা রচনায় অভূতপূর্ব চমকের সৃষ্টি করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের সংগে সম তালে কবিতার আংগিক, ছন্দ ও উপস্থাপনা নিয়ে রীতিমত পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেছেন। প্রচন্ড জীবনবোধ, দেশপ্রেমের অমিয়ধারা এবং প্রবাসী জীবনযাত্রার মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি তাদের কবিতায় সংযোজন করেছিলো উচ্চতর মাত্রা। বিস্মযকর ব্যাপার এ্ই যে, এইসব কবির অনেকের জন্ম এবং লালন-পালন এইদেশ্।ে এতদসত্ত্বেও তাদের মননশীর সাহিত্যচেতনা বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যকে আশ্রয় করে ধৃত হয়েছে।

    এই মন্তব্য একটি ভ্রম হতে পারে,- অধুনা যুক্তরাজ্যের সাহিত্য আন্দোলন স্তিমিত। বলাবাহুল্য, আন্দোলন স্তিমিত, কিন্তু সাহিত্য বা কবিতা রচনা নয়। বহু কবি নীরবে একান্তে নিরলস কাব্য-সাধনা করে যাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যে বাংলা কবি-সাহিত্যিকের কমতি না থাকলেও বাংলা প্রকাশনার অবস্থা অতীব শোচনীয়। ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠিগত প্রচেষ্টায় কিছু কিছু প্রকাশনা ঘটছে বৈকি। কিন্তু বানিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থার অভাবে যুক্তরাজ্যের কবিদের অমূল্য রচনাসম্ভার যুক্তরাজ্যের বাংগালী পাঠক-পাঠিকার কাছে এবং বাংলাদেশের সাধারন মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম নয়। ফলে, গভীর দুঃখের সংগে বলা যেতে পারে, বাংলা সাহিত্যের উচ্চমানের এইসব রচনা-সম্ভার থেকে কাব্যরসিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। কি আশ্চর্য্য র্বাপার, প্রাপ্তিযোগের কোনো সম্ভাবনা নেই জেনেও নিবেদিত প্রাণ প্রবাসী কবি-সাহিত্যিরা একাগ্রমন্য সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত আছেন।

    যুক্তরাজ্যের বহু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর অনেক প্রধান ভাষাগুলির সাহিত্য-চর্চা স্তিমিত। সেক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী সাহিত্য সংগঠন ও সংযোজন প্রভূত। তাদের এই সাহিত্য সাধনা মহার্ঘ। বাংলাদেশের জাতীয়তাবোধের চেতনায় নিয়ত উদ্বুদ্ধ, ভাষা সংগ্রামের অধিকার অর্জনের প্রত্যয়ে উদ্ভাসিত এই প্রজন্মের কবিরা, যাদের একুশে ফেব্র“য়ারীর সংগে কোনো প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই, বাংলাদেশের সংগে কায়িক পরিচয় স্বাল্পিক অবসরের সীমাবদ্ধতায়, তারা কি অমিত জীবনবোধে সম্পৃক্ত হযে বলছেন বাংলাদেশের শ্যামল রঙ রমনীর কথা। বিলাতের অগোছালা কক্ষে বসে রচনা করছেন বাংলাদেশের চাপা পড়া মানুষের ইতিকথা। তাদের কবিতা চিত্রপটে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানব-মানবী অপরূপ বর্নচ্ছটায় সমুপস্থিত।

    কবিতা, যার সংগে আমাদের আঁতাত শুরু জন্মলগ্নে, দেশ ও সময়ের ব্যবধান, জীবন ও জীবিকার ক্রমবর্ধমান তাগিদ, সব কিছুকে উপেক্ষা করে, সে আমাদের মনের মাঝারে মরমে মরমিয়া হয়ে আমাদের সংগেই আছে।

    কবিতা যে আমাদের আমৃত্যু জন্মসহচরী। 




































 

ARTICLE ABOUT POETRY FESTIVAL 2008 BY KETAKI KUSARI DYSON

24/08/2009 14:46

SanghatiFestivalReport.pdf (126,3 kB)

Shanghati's Face Book

24/08/2009 00:56

http://www.facebook.com/search/?q=shanghati+london&init=quick#/profile.php?id=100000165065097.

Items: 1 - 8 of 8