বাংলা কবিতা উৎসব ২০০৯

বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে সমাপ্ত হলো লন্ডনের দ্বিতীয় কবিতা উৎসব

কাইয়ুম আবদুল্লাহ

 

দুঃখী, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে - আসাদ চৌধুরী

ভালবাসার ডাকনাম লন্ডন - হাবীবুল্লাহ সিরাজী

স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও জারি গানের বর্ণাঢ্য আয়োজন আর বিপুল সংখ্যক কবি-সাহিত্যিকদের স্বঃস্ফূর্ত উপস্থিতির মধ্যদিয়ে সমাপ্ত হলো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন সংহতি আয়োজিত লন্ডনের দ্বিতীয় কবিতা উৎসব। ২৫ অক্টোবর রোববার দুপুর ২টায় পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্প অর্পন এবং রং-বেরয়ের বেলুন উড়িয়ে কবিতা উৎসবের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথি কবি আসাদ চৌধুরী ও হাবীবুল্লাহ সিরাজী। উদ্বোধন ঘোষণার পর বৃটেনের বিভিন্ন শহর থেকে আগত কবি-সাহিত্যিকদের বর্ণাঢ্য র‌্যালী বিভিন্ন জনপ্রিয় কবিতার পংক্তিমালা ও দেশাত্মবোধক গানের চরণ সম্মিলিত উচ্চারণের মধ্যদিয়ে শহীদ মিনার থেকে বাংলা টাউনের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উৎসবস্থল ব্রাডি আর্টস সেন্টারে এসে মিলিত হয়। অতঃপর বিকেল ৪টায় ব্রাডি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা উৎসবের মূল পর্ব তৃতীয় বাংলার কবিদের লেখা পাঠের আসর। এ পর্বের সূচনা হয় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সদ্যপ্রয়াত চারণকবি শাহ আব্দুল করিমের গান পরিবেশনের মাধ্যমে। লন্ডনের জনপ্রিয় শিল্পী মিতা তাহের একঝাঁক শিশু শিল্পীদের নিয়ে ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’ এবং ‘আমি তোমার কলের গাড়ি’ গান দুটো পরিবেশন করেন। এছাড়াও শাহ আব্দুল করিমের উপর নির্মিত একটি ডকুমেন্টারীও প্রদর্শিত হয়।
এবারের কবিতা উৎসবে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি আসাদ চৌধুরী ও জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। কবিতা উৎসবের আয়োজক সংগঠন সংহিত’র সভাপতি কবি ফারুক আহমদ রনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উৎসবের মূলপর্বে অতিথিদ্বয় তাদের বক্তব্যে বাংলাদেশের বাইরে বাংলা ভাষাভাষী কবি-সাহিত্যিকদের এমন উৎসব দেখে তাদের অভিভূত হওয়ার কথা ব্যক্ত করেন এবং স্বরচিত কবিতা পড়ে মুগ্ধ করেন উপস্থিত দর্শকদের।
কবি আসাদ চৌধুরী ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভীষিকাময় ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, কখনো ভাবতে পারিনি বাংলা ভাষায় আর কথা বলব, লিখবো এবং এভাবে উৎসব করবো। তিনি বলেন, বাংলার মাটি এবং আমাদের কবিতা রক্তমাখা। তিনি আরো বলেন, এ স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি আমরা দুঃখী-অসহায় মানুষের মুখে হাসি না ফোটাতে পারি। তিনি এখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আসাদ চৌধুরী তার মূল বক্তব্যে উপস্থিত কবি-সাহিত্যিকদের উদ্দেশ্যে চর্যাপদ থেকে এসময়ের বাংলা কবিতার বিবর্তন বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত পটভূমিও বর্ণনা করেন।
কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী লন্ডনে উৎসবমুখর এমন আয়োজন এবং উদ্যোক্তাদের আন্তরিকায় অভিভূত হয়ে বলেন, ভালবাসার ডাক নাম লন্ডন। তিনি তার মূল বক্তব্যে ‘কী কবিতা হয় কী কবিতা নয়’ বিষয়ে লিখিত প্রবন্ধের সারক্ষেপ তুলে ধরেন।
উল্লেখ সাংস্কৃতিক সংগঠন সংহতি ২০০৮ সালে লন্ডনে প্রথম কবিতা উৎসবের আয়োজন করে। এবারের উৎসব উৎসর্গ করা হয় চারণকবি শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। কবিতায় এবারে সংহতি সাহিত্য পদক ২০০৯ পান কবি মুজিব ইরম, বিশিষ্ট সাংবাদিক আব্দুল মতিনকে আজীবন সংহতি সম্মাননা পদক ২০০৯ এবং শাহ আব্দুল করিমকে সংহতি মরণোত্তর পদক প্রদান করা হয়। এছাড়াও উৎসবে আমন্ত্রিত দু’অতিথি কবিকে সংহতি বিশেষ গুণীজন সম্মাননা পদক-২০০৯ এ ভূষিত করা হয়।
কয়েক পর্বে বিন্যস্ত উৎসবে বৃটেনের বিভিন্ন শহর থেকে আগত নবীন-প্রবীণ কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের পাশাপাশি ছিলো আবৃত্তি, পদক বিতরণ, জারি গান ও নৃত্য। পুরো অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার রূপা চক্রবর্তী, ছড়াকার দিলু নাসের, কবি রেজওয়ান মারুফ, ইকবাল হোসেন বুলবুল ও আনোয়ারুল ইসলাম অভি। স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন মঞ্জুলিকা জামালী, আতাউর রহমান মিলাদ, বিথী চৌধুরী, সাইফুদ্দিন আহমদ বাবর, শাহ শামীম আহমদ, জামিল সুলতান, জহিরুল ইসলাম, নুরুন্নাহার শিরীন, কাজল রশিদ, আহমদ রনি, জিল্লুল হক শান্ত, অলি রহমান, শাহ সুহেল, মিলটন রহমান, মোহাম্মদ হাসান, গোলাম কবির, কাইয়ূম আবদুল্লাহ, সাজেদা সৈয়দ বীণা, আবু মকসুদ, মোহাম্মদ সাঈদুজ্জামান কাফি, ওয়ালি মাহমুদ, মাজেদ বিশ্বাস, শাহনাজ সুলতানা, সৈয়দ আফসার, সৈয়দ মবনু, আনোয়ারুল ইসলাম অভি, ইকবাল হোসেন বুলবুল, মুজিব ইরম, তাবাসসুম ফেরদৌস, ফায়সাল আইয়ূব, আবু সাঈদ আনসারী, সামসুল ইসলাম শাহ আলম, শামসুল জাকি স্বপন, শামসুল হক এহিয়া, শামীম শাহান ও আহমদ হোসেন হেলাল প্রমুখ তৃতীয় বাংলার কবিবৃন্দ।
আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার উদয় শংকর দাস, শহীদুল ইসলাম সাগর, মুনিরা পারভিন, ফরিদা ইয়াসমিন জেসী, সালাউদ্দিন শাহীন, আনিসা শার্লিন, স্নিগ্ধা আহাদ, মিসবাহ জামাল ও তোফায়েল আহমেদ।
শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কবি কাদের মাহমুদ, সৈয়দ শাহীন, শামীম শাহান ও রহমান জিলানী প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধে বিলেত প্রবাসীদের অবদান বন্দনা করে কবি মুজিবুল হক মনি রচিত জারি গানে কন্ঠ দেন শেখ নুরুল ইসলাম বয়াতী, সাদেক আহমদ সাদী, ইবানা জাহান ও মতিউর তাজ। সংহতি সেক্রেটারী আবু তাহেরের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া দিনব্যাপী উৎসব সংহতি সভাপতি কবি ফারুক আহমদ রনির সমাপনী বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সফল সমাপ্তি ঘটে।

তৃতীয়বাংলা কবিতা উৎসব

Picturs from Bengali Poetry Festival 2009

 

 

  

  

 

PICTURES: RALLY